কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

‘আল্লাহর নির্দেশে’ প্রতিষ্ঠা করা হবে ন্যায়বিচার

জাতির উদ্দেশে ভাষণে জামায়াত আমির
‘আল্লাহর নির্দেশে’ প্রতিষ্ঠা করা হবে ন্যায়বিচার

জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে ‘আল্লাহর নির্দেশে’ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নেতৃত্বের মূল ধারায় তাদের আনা হবে বলে জানান তিনি।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মাধ্যমে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এমন কথা বলেন জামায়াত আমির। প্রায় ১৯ মিনিটের ভাষণের শুরুতে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হচ্ছে আমানত। সেটি কোনো উপভোগের বিষয় নয়। সর্বাবস্থায় আমরা স্মরণে রাখব, ‘আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং আমাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’। আমরা হজরত ওমরের সেই বিখ্যাত উক্তি ও দায়িত্বশীলতা মনে রাখব, ‘ফোরাতের তীরে একটি কুকুর না খেয়ে মরে গেলেও আমি ওমর দায়ী থাকব’। ‘আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকব,ইনশাআল্লাহ’ বলেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।

জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘গতানুগতিক রাজনৈতিক ভাষণ দিতে নয়, আজ আমি একেবারে মনের ভেতরের কিছু কথা বলতে চাই। যে কথাগুলো একজন জেন-জি, একজন যুবক, আর আমাদের প্রজন্ম সবার সঙ্গে সম্পৃক্ত। একজন মুসলমানের জন্য যেমন, তেমনি আমাদের দেশের অন্য ধর্মের ভাই-বোনদের জন্যও। আমি জুলাইয়ের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি, সেইসঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদেরও গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে আহতদের দ্রুত আরোগ্য ও সুস্থতা কামনা করছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা জুলাই আর চাই না; আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে আর কোনোদিন জনগণকে রাস্তায় নামতে না হয়। আমাদের বুঝতে হবে, জুলাই কেন হয়েছিল। জুলাই হয়েছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য। জুলাই হয়েছিল একটি কালো রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তনের জন্য। যুগের পর যুগ ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পরিবারতন্ত্রের হাতে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে। সেখান থেকে মুক্তির জন্য।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে জাতির ওপর এমন এক শাসকগোষ্ঠী চেপে বসে, যারা মানবাধিকার, ভোটাধিকারসহ সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ফেলে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালায়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন নামে তামাশার মাধ্যমে আমদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এসব নিপীড়ন ও অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্যই এসেছিল রক্তাক্ত জুলাই। আমাদের তরুণরা এখন একটা নতুন দেশ দেখতে চায়। যে দেশকে তারা গর্ব করে বলতে পারবে নতুন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ২.০।’

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। এ সংস্কার প্রক্রিয়া জারি রাখাসহ সংস্কার নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। এ গণভোট জনগণের সাধারণ ইচ্ছা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চাই।”

তিনি বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশে আমাদের পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও অঙ্গীকার স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশে আমরাই প্রথম পলিসি সামিটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিকৌশল জনগণের সামনে তুলে ধরেছি। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এর প্রতিফলন রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশের এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা অবদান রেখেছেন। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে বসেছি এবং তাদের মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ নিয়েছি। সুযোগ পেলে, মহান আল্লাহর ইচ্ছায় জনগণের ভালোবাসায় আমরা সরকার গঠন করলে প্রথম দিনে ফজর নামাজ পড়েই আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করব, ইনশাআল্লাহ।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘অতীতে উন্নয়ন প্রকল্প ব্যক্তিগত ও দলীয় লুণ্ঠনের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ ব্যবস্থার অবসান ঘটানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। অতীতে জামায়াতে ইসলামী থেকে যারা জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদ, সরকার ও স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালন করেছে, তারা কেউ-ই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হননি। দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের মানুষই তার সাক্ষী। ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চাইলে আমাদের আগামী নির্বাচন নিয়ে নৈতিকভাবে ভাবতে হবে। রাজনৈতিক কথার ফুলঝুরির বাইরে এসে বাস্তবতার আলোকে সৎ, দক্ষ, নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছি যে, আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরির জন্য ৫টি বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ এবং ৫টি বিষয়ে ‘না’ বলতে হবে। সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে আমরা ‘হ্যাঁ’ বলতে বলেছি। কারণ এসব মৌলিক শর্ত ছাড়া বৈষম্যহীন, উন্নত, নৈতিক, মানসম্পন্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পাশাপাশি দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব, চাঁদাবাজিকে স্পষ্ট করে ‘না’ বলতে হবে।”

নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘যে সমাজ নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। আমরা ক্ষমতায় এলে নারীরা শুধু ঘরের ভেতরে নয়, সমাজের মূল ধারার নেতৃত্বে থাকবেন সগৌরবে। সবখানে তাদের মেধার মূল্যায়ন হবে কোনো বৈষম্য ছাড়াই। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, কোনো মা-বোনকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না। আপনাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গী হোন। একটি উন্নত ও আধুনিক দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে আমাদের নির্বাচিত করুন। এই বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার। কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করবে না। যদি কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাত করার চেষ্টা করে, আমরা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে হলে তিনটি জায়গায় আমাদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একটি হচ্ছে শিক্ষা সংস্কার। শিক্ষা হতে হবে নৈতিকতাভিত্তিক এবং সেটা হতে হবে টেক বেজড। সন্তানদের হাতকে দক্ষ কারিগরের হাত হিসেবে গড়ে তুলতে চাই এবং তাদের বেকার ভাতা দিতে চাই না। দ্বিতীয় জায়গাটা হচ্ছে বিচারাঙ্গন। ন্যায়বিচার সমাজে প্রতিষ্ঠা হলেই শুধু আমরা আমাদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে পারব। অতএব, বিচার বিভাগকে ঢেলে সাজাতে হবে। তৃতীয় জায়গাটা হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। এই ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে দেশকে আগানো সম্ভব নয়। সুতরাং অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করতে হবে। আশা করব, দেশবাসী আমাদের সহযোগিতা করবেন।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘আলেম সমাজ দেশ গড়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরি করব। বৈশ্বিক উন্নয়ন চ্যালেঞ্জসমূহ; বিশেষত, জলবায়ু পরিবর্তন নিরসনে আমরা সাধ্যমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করব। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হবে।’

প্রবাসীদের অবদান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে আপনারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নতুন বাংলাদেশে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে ইতিহাস রচনা করেছেন। আমরা চাই প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে।’

নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সভা-সমাবেশে যোগ দিয়ে কথা শোনার জন্য জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান শফিকুর রহমান। প্রচারণা বা অন্যান্য কার্যক্রমে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি। জামায়াত আমির বলেন, ‘আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সব রাজনৈতিক দলের জন্য একটি বিরাট নৈতিক দায়িত্ব। যদিও প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, দল ও জোটের নেতাকর্মীরা নিরলসভাবে পরিশ্রম করছেন। সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা।’

তিনি সবার উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের অঙ্গীকার ও স্বপ্নকে বিশ্বাস করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের প্রতি সমর্থন দেবেন। ১২ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের দাঁড়িপাল্লা মার্কায় এবং এলাকায় ১১ দলীয় প্রতীকে ভোট দেবেন, এ আকুল আবেদন আপনাদের প্রতি রাখলাম। আসুন, বিগত দিনের রাজনীতি পরিহার করি। একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরি করি, যেখানে সবাই মান-ইজ্জত-মর্যাদা নিয়ে বাস করবে।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

লাম্পি রোগে বাড়ছে গরুর মৃত্যু, ডিমলায় আতঙ্কে খামারিরা

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত ৮

কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

বৃহস্পতিবার রাজধানীর যেসব এলাকায় মার্কেট বন্ধ

কালবেলায় সংবাদ প্রকাশের পর বাঁকখালী নদী পরিদর্শনে ইউএনও

ইউএনজিএর সভাপতি হিসেবে কী দায়িত্ব ও মর্যাদা পাবেন খলিলুর রহমান

‘সম্পাদক পরিষদ’ গঠন হয় কীভাবে, জানালেন সাবেক এক সদস্য

মির্জা ফখরুলকে সারজিসের প্রশ্ন

৩০ বছর পর দখলমুক্ত সরকারি রাস্তা

হাদি হত্যায় তার বড় ভাইয়ের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে : ফারুক হাসান

১০

সরকারকে ধন্যবাদ দিয়ে ‘সব নিরপরাধ মায়ের’ মুক্তি চাইলেন আইভী

১১

ওসির নেতৃত্বে থানায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত 

১২

নিঃসঙ্গ মায়ের মৃত্যু ঘিরে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগ ছেলের

১৩

রিজার্ভ আরও বাড়ল

১৪

মায়ানমারে পাচারের পথে বিপুল সিমেন্ট জব্দ, আটক ৯

১৫

কারামুক্ত আইভী লড়বেন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে

১৬

পদত্যাগের দুদিন পর পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর প্রতি দীপেন দেওয়ানের বার্তা

১৭

এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ

১৮

৫ দিন দেশের আবহাওয়া কেমন থাকবে?

১৯

প্রিমিয়ার ব্যাংকের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর নূরুল আলমের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

২০
X