কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

একুশের চেতনায় মানবিক গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার প্রত্যয়

শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে উঠল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার
একুশের চেতনায় মানবিক গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার প্রত্যয়

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানী ঢাকার রাজপথে শুরু হয় একুশের পদযাত্রা। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে গতকাল শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ঢল নামে অগণিত মানুষের। তাদের কারও হাতে ফুলের তোড়া, কারও হাতে ফুলের মালা আবার কারও হাতে ছিল পুষ্পস্তবক। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশাসহ সর্বস্তরের মানুষ হৃদয়ে গভীর আবেগ নিয়ে খালি পায়ে সারিবদ্ধভাবে একে একে ভাষা শহীদদের প্রতি জানান ফুলেল শ্রদ্ধা। তাদের অনেকেরই পরনে ছিল একুশের প্রতীক সাদা-কালো পোশাক। যাতে খচিত শহীদ মিনারের প্রতিকৃতি, বাংলা বর্ণমালা (অ, আ) বা শোকের প্রতীক হিসেবে বুকে সাঁটানো কালো ব্যাজ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বিস্তৃত হয় এই জনস্রোত। সকাল পেরিয়ে দুপুর না গড়াতেই শহীদ মিনারের বেদি ছেয়ে যায় ফুলে ফুলে। শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষ একুশের চেতনায় মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এর আগে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু হয়। তা চলে সেহরির আগপর্যন্ত। সেহরি শেষে সকাল সাড়ে ৬টায় প্রভাতফেরির মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু করেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। গতকাল রক্তস্নাত মাতৃভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পূর্ণ হলো। রাজধানীসহ সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে দিবসটি পালিত হয়।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা: অমর একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি শ্রদ্ধা জানিয়ে শহীদ মিনার এলাকা ত্যাগ করার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাত ১২টা ৮ মিনিটে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এবারই প্রথম শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাতে অংশ নেন। এরপর তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য ও নিজের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আবারও শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির পর তিন বাহিনী প্রধানের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এর আগে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদ ও অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা এবং ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানসহ অন্যরা। এ সময় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং এর বিভিন্ন সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আরও শ্রদ্ধা জানান পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম ও ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। এ সময় পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধান গোলাম রসুলসহ বাহিনীটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও অন্যান্য পদবির সৈনিকরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও র্যাবের মহাপরিচালক কে এম শহিদুর রহমান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

বিরোধীদলীয় নেতার শ্রদ্ধা নিবেদন: জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবারই প্রথমবারের মতো বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে আসেন। তার নেতৃত্বে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শীর্ষ নেতারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় তারা শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত করেন।

শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার ব্যাখ্যায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রাচারের অংশ হিসেবে এ কর্মসূচি পালন করেছেন তিনি। ফুল দেওয়ার পর সাংবাদিকরা জামায়াতের আমিরের কাছে জানতে চান যে, আগে কখনো না এলেও এবার আসার কারণ কী? জবাবে জামায়াত আমির বলেন, ‘এবার রাষ্ট্রীয় আচার হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে আমাকে আসতে হবে আমার সঙ্গীদের নিয়ে। তাই আমি এসেছি।’

বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম ও মুজিবুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহসহ কয়েকজন নেতা। ফুল দেওয়ার পর শহীদ মিনারে দাঁড়িয়েই ভাষা শহীদদের জন্য দোয়া ও মোনাজাত করেন তারা।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৬৮টি আসনে জয়ী হয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াত। তাদের নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মোট আসন ৭৭টি। শফিকুর রহমান এরই মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন।

দেশজুড়ে কর্মসূচি: অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গতকাল ছিল সরকারি ছুটির দিন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। এদিন সারা দেশে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, কালো ব্যাজ ধারণ ও প্রভাতফেরি হয়। বাংলাদেশ বেতার, বিটিভি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ ক্রোড়পত্র।

রক্তঝরা ইতিহাস ও সংগ্রাম: তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে প্রথম ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও যুবসমাজ ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসেন। মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক শহীদ হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি পুনরায় রাজপথে নেমে আসে সাধারণ মানুষ। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের গায়েবি জানাজায় অংশ নেন। ভাষা শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা হয়, যা তৎকালীন সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দেয়।

রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি: ভাষা আন্দোলনের দুর্বারগতিতে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৭ মে গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সংবিধানে পরিবর্তন এনে বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন বিল’ পাস হয়, যা কার্যকর হয় ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ থেকে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি: বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সেখানে ১৮৮টি দেশ সমর্থন জানালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোতে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। ‘এখন থেকে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করবে জাতিসংঘ’—এমন একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয় ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে। সেখানে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল বাংলাদেশ। সেই থেকে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে গতকাল যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হয়। বাঙালির প্রাণের এই দিনে সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় সেই কালজয়ী গান—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নানাবাড়িতে বেড়াতে এসে লাশ হলো মুনতাহা

শত্রুরা ইরানের জনগণের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করছে : মোজতবা খামেনির

মোগলহাট স্থলবন্দর পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার : চেয়ারম্যান

‘জামায়াত নেতার বেদে মেয়েদের চুল কেটে দেওয়ার’ দাবিটি ভুয়া

কক্সবাজারে মাটিচাপায় দুই শ্রমিক নিহত

উন্নয়ন বরাদ্দের তালিকায় অস্তিত্বহীন মসজিদ, বিএনপি নেতাকে শোকজ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ

দেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়েছে : স্টেফান লিলার

ডেঙ্গু ঝুঁকিতে ডিএসসিসির ৬৩ ওয়ার্ড, ২৭টি চরম ঝুঁকিপূর্ণ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা’ সংক্রান্ত সভা

১০

থানায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পেটানো সেই ওসি প্রত্যাহার, মামলার প্রস্তুতি

১১

এনসিপির এক কমিটির কার্যক্রম স্থগিত

১২

নির্বাচনের আগেই তারা আমাকে হারিয়ে দিয়েছিল : মির্জা ফখরুল

১৩

বিশ্বকাপের ভেন্যুতে নিষিদ্ধ হলো পানির বোতল

১৪

নতুন চেয়ারম্যান ও তিন কমিশনার পেল বিএসইসি

১৫

একাকী অনুশীলন করছেন মেসি

১৬

বিএসইসির চেয়ারম্যান হলেন ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের মাসুদ খান

১৭

নেইমার নাকি ভিনি, ১০ নম্বর জার্সি কার

১৮

মার্কিন নাগরিককে ধরে নিয়ে গেছে ইসরায়েলি বাহিনী

১৯

বিশ্বকাপ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করল অপ্টা

২০
X