

ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমছে। এ যুদ্ধের এক মাসের মাথায় এসে তাকে কঠিন সব বিকল্পের মুখোমুখি হতে হচ্ছে—হয় তড়িঘড়ি করে একটি সম্ভাব্য ত্রুটিপূর্ণ চুক্তি করে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে অথবা সামরিকভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল করে—এমন এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি নেওয়া, যা তার প্রেসিডেন্ট পদকেই গ্রাস করতে পারে।
ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর তেহরান অভাবনীয় প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। তাদের প্রতিশোধমূলক হামলায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে জ্বালানির সরবরাহের অন্যতম জলপথ হরমুজ প্রণালি। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু হলেও তা বাধার
সম্মুখীন হচ্ছে। ট্রাম্পের এ উদ্দেশ্য নিয়ে ইরান গভীরভাবে সন্দেহ করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করায় কূটনীতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শনিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের আরেকটি সপ্তাহ শেষ হলেও ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংকট নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন। এদিকে ইরান উপসাগরীয় তেল ও গ্যাস পরিবহনের ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন মূল প্রশ্ন হলো—ট্রাম্প কি এ যুদ্ধ কমিয়ে আনবেন, নাকি আরও বাড়াবেন। সমালোচকদের ভাষায়, এটি একটি ‘ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ’, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে এবং সংকটকে পুরো অঞ্চলের বাইরে ছড়িয়ে দিয়েছে।
ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন, তিনি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চান না এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চান। তিনি চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার কথা বললেও, এর সময়সীমা অনিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে। একই সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছেন।
ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য ট্রাম্প একটি ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন (পাকিস্তানের মাধ্যমে গোপনে); কিন্তু তা সফল হবে কি না স্পষ্ট নয়।
একজন বিশ্লেষক বলেন, ‘এ যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ভালো কোনো বিকল্প নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, কোন ফলকে সফল বলা হবে, তা স্পষ্ট নয়।’
যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা: ট্রাম্প অতিরিক্ত সেনা পাঠাচ্ছেন, ইরানকে আরও কঠোর হামলার হুমকি দিচ্ছেন। প্রয়োজনে স্থলবাহিনীও ব্যবহার করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে ইরানের ওপর চাপ বাড়তে পারে; কিন্তু এতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও আছে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো—যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল করে ‘বিজয়’ ঘোষণা করে সরে আসতে পারে। তবে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে না, যদি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে না দেওয়া হয়, যা ইরান এখনো করতে দিচ্ছে না।
অর্থনীতি ও রাজনীতিতে চাপ: এ যুদ্ধের ফলে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে, যার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে এ যুদ্ধ খুবই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমে ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এ ছাড়া আসন্ন নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রিপাবলিকান নেতারা।
কূটনৈতিক জটিলতা: ট্রাম্পের দেওয়া ১৫ দফা প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র কমানো এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলো ত্যাগ করার মতো কঠিন শর্ত রয়েছে, যা ইরান অযৌক্তিক বলে মনে করছে।
ইরান এখনো আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ না করলেও দ্রুত কোনো সমাধানের দিকে যাচ্ছে না। তাদের ধারণা, শুধু টিকে থাকলেই তারা ‘বিজয়’ দাবি করতে পারবে।
যুদ্ধ আরও বাড়ার ঝুঁকি: যদি যুক্তরাষ্ট্র স্থলবাহিনী পাঠায়, তাহলে বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে—যেমন ইরাক বা আফগানিস্তানের যুদ্ধের মতো দীর্ঘ সংঘাত।
মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে, কারণ এতে ইরান আরও পাল্টা হামলা চালাতে পারে।
বিভ্রান্তিকর বার্তা: ট্রাম্প কখনো বাজারকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন, আবার কখনো কঠোর হুমকি দিচ্ছেন, যার ফলে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। একজন বিশ্লেষক বলেন, ‘ট্রাম্পের বক্তব্য প্রায়ই পরস্পরবিরোধী—এতে প্রতিপক্ষ বিভ্রান্ত থাকে।’