

বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখার আগেই ব্রাজিল সমর্থকরা নির্ভার—বিশ্বকাপ অভিযানের শুরুতে টানা ২০ ম্যাচ হারেনি সেলেসাও। ‘হেক্সা জয়’ সংক্রান্ত স্বপ্ন বুকে নিয়েই মাঠে নামছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা, প্রতিপক্ষ ২০২২ বিশ্বকাপের বিস্ময়—মরক্কো।
নিউইয়র্কের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে দুই মহাদেশের দুই প্রতিনিধির আজকের এই লড়াই নিছক একটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ নয়, এটি দুটি মহাদেশের ফুটবল গর্বের সরাসরি সংঘাত। ফিফা র্যাংকিংয়ে ব্রাজিল ষষ্ঠ, মরক্কো সপ্তম—ব্যবধান মাত্র এক ধাপের। কিন্তু ফুটবলীয় গৌরব, অর্জনের মানদণ্ডে বিচার করলে লড়াইটা কিন্তু অসম! সাম্প্রতিক সময়কে মানদণ্ড ধরলে মরক্কোকে কিন্তু হিসাবের মধ্যেই রাখতে হচ্ছে।
২০২২-এর কাতার বিশ্বকাপে দেশটি যা করেছে, তা ছিল ঐতিহাসিক—গ্রুপ পর্বে বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়াকে থামানোর পর নকআউটে স্পেনকে টাইব্রেকারে এবং পর্তুগালকে সরাসরি হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠা আফ্রিকার প্রথম দল। সেই গল্প এখনো বিশ্ব ফুটবলের আলোচনায় জীবন্ত। সেই উত্তেজনার পরশ আর আটলাস লায়ন্স নামের মাহাত্ম্য প্রমাণে আজ মাঠে নামছে মরক্কো।
ওদিকে দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাই পর্বে কিছু হতাশাজনক ফলে ২৩তম আসরের টিকিট প্রাপ্তির পর কঠিন হয়ে উঠেছিল বটে, সে শঙ্কা পিছু ফেলেছে সেলেসাওরা। পরবর্তী সময়ে কোচ নিয়োগের রীতি ভেঙে দলের দায়িত্ব দেওয়া হয় কিংবদন্তি ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে। সিদ্ধান্তটি যথার্থ কি না এখনো প্রমাণিত নয়। প্রমাণের বড় মঞ্চ হতে পারে বিশ্বকাপ। দক্ষিণ আমেরিকার বাছাই পর্বে আর্জেন্টিনার কাছে ৪-১ গোলে হারের ধাক্কার পর পঞ্চম হয়ে মূল পর্বে আসে ব্রাজিল। দলটি এখন বিশ্বের সামনে নিজেদের নতুন করে প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জের সামনে। আনচেলত্তির ৪-২-৩-১ ছকে আক্রমণে ভরসা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনহা। তরুণ এনদ্রিকও প্রাক-বিশ্বকাপ প্রীতি ম্যাচে নিজেকে চিনিয়েছেন। কোচ নিজেই রাফিনহাকে বলেছেন বিশ্বের সেরা আক্রমণাত্মক ফুটবলারদের একজন। পেশির সমস্যায় থাকায় নেইমার দলের সঙ্গে থাকলেও রয়েছেন গভীর পর্ষবেক্ষণে। দলের রক্ষণভাগ সামলাতে মার্কিনহোস ও আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস প্রস্তুত আছেন। দ্রুতগতির ট্রানজিশন ও ফাঁকা জায়গা কাজে লাগানোর কৌশলে কার্যকরী অস্ত্র হতে পারে পাকেতা-গুইমারেস। মাঝমাঠের যোদ্ধা কাসিমিরো দলের প্রয়োজনে আক্রমণে যোগ দিতে সক্ষম। প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে তার হেড-ওয়ার্ক ছিল প্রতিপক্ষের জন্য ভীতির কারণ। ম্যাথিউয়াস কুনহাও ছন্দে আছেন। এখন সব রসদ একসঙ্গে গাঁথতে পারলেই ব্রাজিলকে সাম্বার ছন্দে দেখা যাবে। আনচেলত্তির চ্যালেঞ্জ এটাই।
অন্যদিকে মাত্র তিন মাস আগে দায়িত্ব নেওয়া নতুন কোচ মোহামেদ ওয়াহবি মরক্কোকে দিয়েছেন আরও আক্রমণাত্মক রূপ। ২০২৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ী এই কোচ মাঠের এক প্রান্ত ধরে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরির পাশাপাশি দ্রুত কম্বিনেশনে প্রতিপক্ষকে অস্থির করে দেওয়ার ফুটবল খেলাচ্ছেন। দলের মেরুদণ্ড পিএসজি তারকা আশরাফ হাকিমি—প্রধান কাজ রক্ষণ সামলানো, আক্রমণে বেশ দক্ষ। আফ্রিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আট ম্যাচের সবকটি জেতা মরক্কোর আক্রমণভাগের কেন্দ্রে থাকবেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ব্রাহিম দিয়াজ। ওয়াহবি ২০২২ সালের সেই অতি মাত্রার প্রতিরক্ষামূলক ‘লো-ব্লক’ কৌশল থেকে বের হয়ে মরক্কোকে একটি আগ্রাসী ও গতিশীল দলে রূপান্তর করেছেন। বিশেষ করে পাল্টা আক্রমণের দক্ষতা তো এখন অন্য দলগুলোর জন্য চিন্তার বিষয়।
বিশ্বকাপের ‘সি’ গ্রুপে ব্রাজিল ছাড়াও মরক্কোর সঙ্গী স্কটল্যান্ড ও হাইতি। প্রথম ম্যাচেই হোঁচট খেলে বাকি পথ কঠিন হয়ে পড়বে উভয় দলের জন্যই। বাজির দরে ব্রাজিল এগিয়ে, ইতিহাসও তাদের পক্ষে। আর ২০২২ বিশ্বকাপের মরক্কো আমাদের শিখিয়ে গেছে—শিরোনামে নাম না থাকলেও ইতিহাস লেখা যায়।
নিউজার্সির শনিবারের রাত তাই শুধু তিন পয়েন্টের হিসাব নয়—এটি আত্মপরিচয়ে নিজেকে প্রমাণের লড়াই। একটি মহান ঐতিহ্যকে নতুন জীবন দেওয়ার লড়াই, আর একটি নতুন প্রজন্মের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লড়াই। রাত শেষে গৌরব না বিস্ময়—ফয়সালাটা হয়ে যাবে নিউজার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামেই।