

তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রপ্তানি প্রণোদনার উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। প্রণোদনায় উৎসে কর অর্ধেক কমানো হলেও ব্যবসায়ীদের কৌশলে ‘বেঁধে’ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী অর্থবছরের অর্থবিলে ন্যূনতম করের বিধানটি তুলে দেওয়া হচ্ছে। এতে সঞ্চয়পত্র থেকে শুরু করে রপ্তানি পণ্যের প্রণোদনাও আয় হিসেবে বিবেচনা করে করারোপের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন খালি চোখে প্রণোদনার কর অর্ধেক কমে গেছে, কিন্তু আইনের সংশোধনী হওয়ায় বছর শেষে তা বেড়ে যেতে পারে ৫ গুণ পর্যন্ত।
সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ন্যূনতম করের বিধানটি বাতিল করা হয়েছে। আয়কর আইনের ১৬৩ ধারায় সংশোধনীর মাধ্যমে এখন রপ্তানি খাতের প্রণোদনায় উৎসে কর ছিল একজন করদাতার ন্যূনতম কর হিসেবে চূড়ান্ত কর বা করদায়। কর প্রদান করলেই বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে যেত। আয়করের নতুন বিধান আরোপিত হওয়ায় উৎসে কর আর থাকছে না। প্রণোদনার এই কর অগ্রিম আয়কর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও এই কর ফেরতযোগ্য। কিন্তু এ ফেরতযোগ্য হওয়ার কারণে একদিকে যেমন করদাতার কর প্রদানের বিষয়টি নিষ্পত্তি হচ্ছে না, অন্যদিকে বছর শেষে অগ্রিম আয়কর বাদে যে পরিমাণে ভর্তুকি পাবে, তা আয় হিসেবে বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সরকারের দেওয়া ১ কোটি টাকার বিপরীতে একজন করদাতা অর্থবছরের প্রথমে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর হিসেবে এনবিআরকে ৫ লাখ টাকা প্রদান করলেন। কিন্তু বছর শেষে দেখা গেল তার আয় ৫ কোটি টাকা হয়েছে। এক্ষেত্রে করদাতার মোট আয় দাঁড়াল ৬ কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে বাকি ৫ কোটির মধ্যে প্রণোদনার অর্থ থাকলেও তার নির্ধারিত করহারে কর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী হলে প্রণোদনার অর্থের ১২ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আর এ খাতের বাইরে হলে দিতে হবে সাড়ে ২৭ শতাংশ। এক্ষেত্রে প্রণোদনার ভর্তুকির ওপরও একই হারে কর দিতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম কালবেলাকে বলেন, ‘ন্যূনতম করের বিধান বাতিল করে প্রণোদনার অর্থের উৎসে করের পরিবর্তে অগ্রিম আয়কর হয়েছে। এতে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। আর অগ্রিম আয়কর হওয়ার কারণে বছর শেষে ভর্তুকির অর্থ আয় হিসেবে বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন পোশাক খাতে ভর্তুকির অর্থ আয় হিসেবে গণণা করা হলে আয়কর ১২ থেকে সাড়ে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এমন ঘটনা ঘটেছিল ২০১০ সালেও। সে সময় আমরা তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে ভর্তুকির অর্থে কীভাবে করারোপ হয়, তা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম। এবারও আমরা এনবিআরকে অনুরোধ করব বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রণোদনার অর্থের করহার ৫ শতাংশ করার জন্য এনবিআরকে ধন্যবাদও জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।
সূত্র আরও জানায়, প্রস্তাবিত বাজেটে ন্যূনতম বিধানে সংশোধনী আনার কারণে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার পরিমাণও কমে যাবে। সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে উৎসে করের পরিবর্তে অগ্রিম আয়কর হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা নির্ধারিত হবে করদাতার করহার অনুযায়ী। আরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুফী মোহাম্মদ মামুন কালবেলাকে বলেন, ন্যূনতম করের বিধান বাতিল করার কারণে বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। প্রণোদনার ক্ষেত্রে উৎসে কর এখন অগ্রিম আয়কর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, উৎসে কর ছিল করদাতার চূড়ান্ত দায়। কারণ, করদাতা চূড়ান্ত দায় পরিশোধ করলেই বিষয়টি এখানে নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। তবে অগ্রিম আয়কর চূড়ান্ত কোনো দায় নয়। বিষয়টি সমন্বয়যোগ্য। অর্থাৎ, বছর শেষে বিষয়টি নিয়ে আরও হিসাব করে নতুন দায়ের সঙ্গে যোগ-বিয়োগ হবে। অর্থাৎ, বছর শেষে করদাতা সমন্বয় করতে পারবেন। তবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে করদাতার করহার অনুযায়ী।