

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হিসেবে পরিচিত ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট। আগে এটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য শাসনের সমার্থকই ছিল। মার্গারেট থ্যাচার বা টনি ব্লেয়ারের মতো নেতারা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশ শাসন করেছেন। অথচ গত এক দশকে এর ‘বাসিন্দা’ পরিবর্তন যেন ছেলেখেলায় পরিণত হয়েছে! যুক্তরাজ্যে বদলেছেন ছয়জন প্রধানমন্ত্রী। কেউ পদত্যাগ করেছেন, কেউ নির্বাচনে হেরেছেন, কেউ দলের ভেতর থেকেই ছিটকে পড়েছেন। ব্রেক্সিটের ধাক্কা, করোনা সংকট, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। ব্রিটিশ রাজনীতির এ নজিরবিহীন অস্থিরতার সূত্রপাত ২০২৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট থেকে। তবে গত ছয় বছরেরও কম সময়ে যুক্তরাজ্য পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে, যা গত এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুততম ক্ষমতার হাতবদল। সেই ১০ ডাউনিং স্ট্রিট এখন আক্ষরিক অর্থেই এক ঘূর্ণায়মান দরজায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভরাডুবির পর প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের এ আসা-যাওয়া নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন হুমায়ূন কবির
ডেভিড ক্যামেরন
ব্রেক্সিট গণভোটের পরই পদত্যাগে বাধ্য হন ডেভিড ক্যামেরন। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজর ২০২২ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ব্রেক্সিটের ডাক দেওয়াই ছিল ক্যামেরনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল।
২০১৬ সালে ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় আসার পর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যামেরন যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রেখে দেওয়ার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। কিন্তু জনগণ তার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে ইইউ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেয়।
গত ১৫ বছরের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৬ বছর দায়িত্ব পালনের পর তিনি পদ ছাড়েন।
থেরেসা মে
ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে ইইউর সঙ্গে দরকষাকষি এবং নিজ দল কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতা ছাড়েন থেরেসা মে।
থেরেসা মে চেয়েছিলেন, পার্লামেন্টের মাধ্যমে ব্রেক্সিট চুক্তি এগিয়ে নিতে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট চুক্তি পাস করানোর জন্য তিনি তিনবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এর ফলে ২০১৭ সালের বিপর্যয়কর নির্বাচনে তার পতন ঘটে।
থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ৩ বছর ১১ দিন।
বরিস জনসন
থেরেসা মের বিপর্যয়কর পরিস্থিতির পর কনজারভেটিভ পার্টি বরিস জনসনের দিকে আশীর্বাদের হাত বাড়ায়। ফলে ব্রিটেন পায় আরও একজন প্রধানমন্ত্রী। বিপুল জনমত নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন বরিস জনসন।
পরের বছরেই তিনি ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন এবং ব্রেক্সিট আন্দোলনকে সফল করেন। ব্রিটিশরা ভেবেছিল, এবার বুঝি ডাউনিং স্ট্রিটে স্থিতিশীলতা এলো। কিন্তু সে আশাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
করোনা মহামারি বরিসের জন্য শিরে সংক্রান্তি হয়ে আসে। ব্রিটেনে দুই লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায় করোনায়। এটি ইউরোপে সর্বোচ্চসংখ্যক মৃত্যু। ফলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন বরিস জনসন। এর মধ্যে সামাজিক দূরত্ব না মেনে পার্টির আয়োজন করে সে সমালোচনার আগুনে আরও ঘি ঢালেন ‘খামখেয়ালি’ বরিস। এ ঘটনার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে এবং জরিমানা দিতে বাধ্য হন। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। সেইসঙ্গে একের পর এক কেলেঙ্কারির কারণে নিজ দলের মন্ত্রীদের গণপদত্যাগের মুখে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনায় বিধিনিষেধ অমান্য, পরিকল্পনায় ঘাটতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জনসনের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। ৩ বছর ৪৪ দিন ক্ষমতায় থাকার পর তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।
লিজ ট্রাস
লিজ ট্রাস মাত্র সাত সপ্তাহের মতো ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি মূলত ধনীদের কর কমিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু ১০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, পাউন্ডের পতন, বন্ধকের হার বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণগুলো ট্রাসকে অথই সাগরে ফেলে দেয়। তার অপরিকল্পিত অর্থনৈতিক নীতি ও কর ছাড়ের ঘোষণায় বন্ড মার্কেটে ধস নামে। অর্থনীতিতে ভয়াবহ ধাক্কা লাগায় তিনি দ্রুত বিদায় নিতে বাধ্য হন।
ঋষি সুনাক
২০২৪ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির ঐতিহাসিক পরাজয় ঘটে। ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রিত্বেরও পতন হয়। এক বছর ৮ মাসের মতো দায়িত্ব পালন করেন তিনি। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার পতনের পেছনে মূল কারণ হলো—দীর্ঘ ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র জনরোষ, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণেও তিনি ব্যর্থ হন।
এ ছাড়া দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পার্টিগেট কেলেঙ্কারি এবং ভুল নির্বাচনি প্রচারও তার পতনকে দ্রুততর করেছে।
অর্থনীতি স্থিতিশীল করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এলেও, দীর্ঘমেয়াদি দলীয় কোন্দল এবং ভোটারদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের কারণে তিনি কনজারভেটিভদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হন।
মহাসংকটে স্টারমার
২০২৪ সালের জুলাইয়ে লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার প্রায় ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটান। এক বিশাল নির্বাচনি বিজয় নিয়ে তিনি ক্ষমতায় আসেন বলে জানায় নিউইয়র্ক টাইমস। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন রাজনীতিকে জনসেবায় ফিরিয়ে আনার এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তার জনপ্রিয়তা কমে মাত্র ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে টাইম ম্যাগাজিন।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে লেবার পার্টি ১ হাজার ৪৬০টির বেশি কাউন্সিল আসন হারিয়েছে। এর বেশিরভাগই গেছে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি দল ‘রিভলভিং ইউকের’ দখলে। পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টারমারের পদত্যাগের দাবিতে এরই মধ্যে নিজ দলের প্রায় ৮০ জনের বেশি এমপি সোচ্চার হয়েছেন। এ ছাড়া মিয়াট্টা ফাহনবুলেহ, জেস ফিলিপসসহ অন্তত চারজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন।
স্টারমার সংসদে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন। কিন্তু নিউইয়র্কের ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, বাস্তবে তিনি ভোট পেয়েছিলেন মাত্র ৩৩ শতাংশ। বিরোধী শিবিরের ভোট বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার কারণেই এ বিশাল জয় সম্ভব হয়েছিল। ফলে জনগণের একটি বড় অংশের ম্যান্ডেট তার সঙ্গে ছিল না।
স্টারমার অজনপ্রিয় হলেন যেসব নীতির কারণে
ক্ষমতায় এসেই স্টারমার সরকার বেশকিছু অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো লাখো প্রবীণ নাগরিকের জন্য ‘উইন্টার ফুয়েল পেমেন্ট’ বা শীতকালীন জ্বালানি ভাতা বাতিল করা। এ ছাড়া উত্তরাধিকার কর নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে বিরোধ এবং পে-রোল ট্যাক্স নিয়ে ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ তার সরকারকে চাপে ফেলেছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ব্রিটিশ বন্ড মার্কেট আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
এদিকে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার কারণে সরকারের ঋণ ব্যয় ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানায় পলিটিকো। নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে দাবি করলেও স্টারমার ব্যক্তিগত উপহার বা ‘ফ্রিবি’ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন।
আলজাজিরা জানায়, স্টারমারের ওপর সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়ার পর। ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে কুখ্যাত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের গভীর বন্ধুত্বের খবর ফাঁস হলে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হন স্টারমার। এ ঘটনা তার নৈতিক অবস্থানকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
লেবার পার্টির ভেতরের বামপন্থি অংশ (করবিনপন্থিরা) স্টারমারের মধ্যপন্থি ও কঠোর নীতির কারণে ক্ষুব্ধ। অনেকেই দল ছেড়ে গ্রিন পার্টির দিকে ঝুঁকেছেন। অভিবাসন নীতি নিয়েও স্টারমার তার প্রতিশ্রুতি পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন বলে ভোটাররা মনে করছেন। স্টারমার দেশবাসীকে ‘জাতীয় নবজাগরণের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তার কথাবার্তা ও কাজের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে। একজন নেতা হিসেবে তিনি জনগণকে অনুপ্রাণিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অনেকের কাছেই তিনি কাঠখোট্টা এবং ‘অতি-নীতিবাগীশ’ হিসেবে পরিচিত বলে জানায় পলিটিকো।