

ইসলামী জ্ঞানভান্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো হাদিসশাস্ত্র। কোরআনের পর হাদিসই মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় বিধান, আদর্শ ও জীবনপথ নির্দেশের প্রধান উৎস। নবীজির বাণী, কাজ, অনুমোদন ও জীবনাচারের বিবরণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রাচীনকালে অসংখ্য মুহাদ্দিস নিরলস প্রচেষ্টা চালান। তাদের এ অমূল্য সাধনার ফসল হিসেবে ইসলামী ইতিহাসে যেসব গ্রন্থ সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ও প্রসিদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত, সেগুলোর মধ্যে সিহাহ সিত্তাহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘সিহাহ সিত্তাহ’ শব্দটির অর্থ হলো ‘বিশুদ্ধ ছয় গ্রন্থ’। এগুলো হলো হাদিসের ছয়টি প্রামাণিক সংকলন, যা সুন্নি মুসলিম সমাজে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ। এই ছয় গ্রন্থ হলো—
১. সহিহ বুখারি: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.) সংকলিত। এটি সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। এর প্রতিটি হাদিস কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সংকলিত হয়েছে।
২. সহিহ মুসলিম: ইমাম মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ (রহ.) সংকলিত। এটি বুখারির পরের স্থানে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসে বেশি সুবিন্যস্ত।
৩. সুনানে আবু দাউদ: ইমাম আবু দাউদ সুলায়মান ইবনে আশআস (রহ.)-এর গ্রন্থ, যাতে ফিকহ বা শরিয়তের বিধান সম্পর্কিত হাদিসগুলো বিশেষভাবে সংকলিত হয়েছে।
৪. সুনানে তিরমিজি: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসা আত-তিরমিজি (রহ.) সংকলিত। এতে হাদিসের পাশাপাশি বর্ণনাকারীদের অবস্থান, হাদিসের মান ও ফিকহি মতভেদও উল্লেখ করা হয়েছে।
৫. সুনানে নাসাই: ইমাম আহমদ ইবনে শুয়ায়ব আন-নাসাই (রহ.)-এর সংকলন। এতে অত্যন্ত নির্ভুল হাদিস সংরক্ষিত হয়েছে এবং এতে দুর্বল বর্ণনা খুব কমই রয়েছে।
৬. সুনানে ইবনে মাজাহ: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজাহ (রহ.)-এর সংকলন। এতে অনেক অনন্য হাদিস সংকলিত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলোতে অনুপস্থিত।
এ ছয় গ্রন্থ ইসলামী শরিয়তের মূলভিত্তি রূপে বিবেচিত। ফিকহ, আকিদা, আখলাক ও সমাজবিধানের ক্ষেত্রে এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম আলেম-উলামা, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা সিহাহ সিত্তাহ অধ্যয়ন করে আসছেন ইসলামী আইন ও জীবনব্যবস্থার সঠিক ধারণা পেতে। সিহাহ সিত্তাহ শুধু হাদিস সংকলনের এক অনন্য ঐতিহাসিক সাফল্যই নয়, বরং এটি ইসলামী সভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলোর অধ্যয়ন একজন মুসলমানকে নববী আদর্শের সঠিক রূপ অনুধাবন ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগে সহায়তা করে।