

দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত ও সংগীতানুরাগীকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন লালনসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ‘লালনকন্যা’খ্যাত ফরিদা পারভীন। শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে চিরতরে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন তিনি। কিংবদন্তি এ শিল্পীর প্রয়াণ বাংলাদেশের সংগীতভুবনের এক অপূরণীয় ক্ষতি। এ শূন্যতা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। আমরা তার বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করি। পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবার ও পরিজনের প্রতি কালবেলা পরিবারের পক্ষ থেকে জানাচ্ছি গভীর সমবেদনা।
ফরিদা পারভীন দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। সর্বশেষ ১৪ দিন চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ফেরানো যায়নি। শেষ পর্যন্ত চিরঘুমের দেশে চলে যান তিনি। মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই আলোচনায় আসে, কোথায় সমাহিত করা হবে বরেণ্য এ শিল্পীকে? শেষ পর্যন্ত কুষ্টিয়ায় তার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিভরা জায়গা, যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন মা-বাবা, সেখানেই কবরস্থ করা হবে তাকে। শিল্পীরই চাওয়া ছিল এটা।
ফরিদা পারভীন ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরে জন্মগ্রহণ করেন। বেড়ে ওঠেন কুষ্টিয়ায়। বাবা ছিলেন চিকিৎসক, মা গৃহিণী। সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়া ফরিদার গানে হাতেখড়ি পাঁচ বছর বয়সে। বাবা-মায়ের উৎসাহে শাস্ত্রীয়সংগীতে তালিম নেওয়া ফরিদার ইচ্ছা ছিল নজরুলসংগীতের শিল্পী হওয়ার। এগোচ্ছিলেনও সে পথেই। রাজশাহী বেতারে নজরুলগীতির শিল্পী হিসেবে গান গাইতে শুরু করেন ১৯৬৮ সালে। গেয়েছেন আধুনিক ও দেশের গানও। তরুণ বয়সে লালনের গান একরকম ‘উপেক্ষিতই’ ছিল তার কাছে। তবে সংগীতের অন্য সব ধারাকে পাশে সরিয়ে কীভাবে, কোন তাড়নায় লালনের গানে নিজেকে বিলিয়েছেন, সে গল্প তিনি জীবদ্দশায় বলেছেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি একসময়ের জনপ্রিয় গীতিকার ও সুরকার আবু জাফরের স্ত্রী ছিলেন। তাদের সংসারে এক মেয়ে ও তিন ছেলে। শুধু লালনের গান নয়, আবু জাফরের লেখা-সুর করা অনেক গানই তার কণ্ঠে অমর হয়ে আছে। যেমন ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’, ‘তোমরা ভুলে গেছো মল্লিকাদির নাম’, ‘নিন্দার কাঁটা’। তবে দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদ ঘটলেও গানই ছিল তার চিরসঙ্গী। ২০০৫ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে জড়ান।
তার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গভীর শোক প্রকাশ করেন। শোকবার্তায় তিনি বলেন, কিংবদন্তিতুল্য লালনগীতি শিল্পী ফরিদা পারভীন নজরুলগীতি ও দেশাত্মবোধকসহ নানা ধরনের গান পরিবেশন করলেও শ্রোতাদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘লালনকন্যা’ হিসেবে। পাঁচ দশক ধরে তার কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। তার গান আমাদের সংস্কৃতির অন্তর্লীন দর্শন ও জীবনবোধকে নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছিল।
নানা রোগ সয়েও লালনচর্চায় নিবেদিত ছিলেন তিনি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে লালন চর্চা ছড়িয়ে দিতে প্রায় ১৬ বছর আগে ঢাকার তেজকুনীপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’। লালনের গান গেয়ে ফরিদা শুধু নিজেই জনপ্রিয় হননি, এই সংগীতকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও পৌঁছে দিয়েছেন। সংগীতের সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে পেয়েছেন একুশে পদক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা পুরস্কার ও সম্মাননা।
আমরা মনে করি, সৃষ্টিশীলতার কখনো মৃত্যু হয় না। শিল্পীদেরও কালের অমোঘ নিয়মে চলে যেতে হয়। তবে তা আর সবার মতোই শরীরীযাত্রার সমাপ্তি। তার সৃষ্টিযাত্রা অবিনশ্বর; তা বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে হাজার বছর ধরে। শিল্পী ফরিদা পারভীন যে সংগীতপ্রতিভার আবেশ ও অনুরাগ ছড়িয়ে গেছেন, তা অনুপ্রেরণা জোগাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বাংলা গান যতদিন থাকবে, ততদিন সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন তিনি।