

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নৃশংস উপায়ে মা-মেয়ে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি গৃহকর্মী আয়েশাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্যে, গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ঝালকাঠির নলছিটি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আলোচিত এ ঘটনায় পুলিশের তৎপরতাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কেননা, অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
গত সোমবার সকালে হত্যার শিকার হন মা লায়লা ও মেয়ে নাফিসা। স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যার ঘটনায় গৃহকর্মী আয়েশাকে আসামি করে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন আ জ ম আজিজুল ইসলাম। মামলায় তিনি বাসার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের একটি বর্ণনা দেন। এতে বলা হয়, আসামি সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে কাজ করার জন্য বাসায় আসে। সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে আসামি তার (বাদী) মেয়ের স্কুল ড্রেস পরে বাসা থেকে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় একটি মোবাইল ফোন, একটি ল্যাপটপ, স্বর্ণালংকার, অর্থসহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যায়। বাদী আজিজুল পেশায় শিক্ষক। মোহাম্মদপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন। ঘটনার চার দিন আগে আয়েশাকে তার বাসায় খণ্ডকালীন গৃহকর্মী হিসেবে রাখা হয়। সোমবার সকাল ৭টার দিকে তিনি কর্মস্থল উত্তরায় যান। কর্মস্থলে থাকাকালে তিনি তার স্ত্রীর মোবাইলে একাধিকবার কল করে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হন। পরে তিনি বেলা ১১টার দিকে বাসায় আসেন। এসে দেখতে পান, মেয়ের গলার নিচে ডান পাশে কাটা। মেয়ে গুরুতর অবস্থায় পড়ে আছে। স্ত্রীর গলাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটা। রক্তাক্ত জখম হয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন রান্নাঘর লাগোয়া করিডোরে। মঙ্গলবার নাটোর শহরের গাড়িখানা কবরস্থানে নিহত দুজনের দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে ঢাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে তাদের মরদেহ নাটোর শহরের বড়গাছা এলাকার পৈতৃক বাড়িতে পৌঁছায়। মা-মেয়ের নিথর দেহ একনজর দেখতে ভোর থেকেই আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা ভিড় জমান। স্বজনের আহাজারিতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
আসামি ধরা পড়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে হয়তো ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে। আপাতত বাসা থেকে অর্থ ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী খোয়া যাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, খুনের পেছনে এগুলোই কারণ হতে পারে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়। শুধু জিনিসপত্রের জন্যই কি দুজনকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে? নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো মিলবে অচিরেই। তবে এ ঘটনা অবশ্যই একটি শিক্ষা দিয়ে গেল।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গৃহকর্মী নিজেকে আয়েশা নামে পরিচয় দেয়। তার বাসার ঠিকানা বলে জেনেভা ক্যাম্প। কিন্তু তাকে কাজে রাখার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র বা বিস্তারিত কোনো তথ্য রাখা হয়নি। ঢাকার মতো একটি জনবহুল ও অপরাধপ্রবণ শহরে একজন অচেনা মানুষ সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই না জেনে বাসাবাড়িতে কাজের জন্য রাখার ব্যাপারে আমাদের কি আরও একটু সচেতন ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন নয়? খোঁজখবর নেওয়া যে, এসব কর্মজীবী মানুষের প্রতি শুধুই সন্দেহ থেকে তা নয়; বরং নিজেদের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ থেকেই করা উচিত।
আমরা মনে করি, মোহাম্মদপুরে জোড়া খুনের ঘটনায় গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সবারই সচেতন হওয়া উচিত। গৃহকর্তার পাশাপাশি সতর্ক হওয়া দরকার বাড়িওয়ালাকেও। বাসাবাড়িতে কে, কারা যাতায়াত করছে, তা ভালোভাবে নজরদারি ও রেকর্ড থাকা জরুরি। আমাদের প্রত্যাশা, এ ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীকে যথাযথ শাস্তির আওতায় আনা হবে।