ড. মো. ছিদ্দিকুর রহমান খান
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৫ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

মানসম্মত শিক্ষার অগ্রাধিকার অপরিহার্য

মানসম্মত শিক্ষার অগ্রাধিকার অপরিহার্য

বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বায়ন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান-অর্থনীতির যুগে বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিছুদিন আগে বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলা উদ্বোধনকালে জ্ঞানভিত্তিক আলোকিত সমাজ গঠনের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ৭ আগস্ট প্রদত্ত এক ভাষণে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন ‘তরুণরা যে স্বপ্ন নিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে মেধা, যোগ্যতা ও জ্ঞানভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।’ বিএনপির নীতিগত ঘোষণাও শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে।

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র বলতে এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বোঝায়—যেখানে জ্ঞান, তথ্য, গবেষণা ও উদ্ভাবনই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এ ধরনের সমাজে মানুষের চিন্তা-সৃজনশীলতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতি নির্ভর করে তার মানবসম্পদের গুণগত মানের ওপর, আর সেই মানবসম্পদ গড়ে ওঠে মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে। তাই একটি আলোকিত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিঃসন্দেহে অপরিহার্য পূর্বশর্ত।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সর্বজনীন শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির হার বৃদ্ধি, নারীশিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতি নির্দেশ করে। তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত হয়েছে কি না, এ বিষয়ে প্রশ্ন করার অবকাশ রয়েছে। বলা যায়, শিক্ষার পরিমাণগত সম্প্রসারণে সফলতা অর্জিত হলেও গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। আমরা জানি যে, শিক্ষা কেবল তথ্য আহরণ বা পরীক্ষায় ভালো ফল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি সমন্বিত রূপান্তর প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ বৌদ্ধিক, নৈতিক ও সামাজিকভাবে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর এরূপ মানুষই একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ফলে একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য শিক্ষার মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ—

প্রথমত, মানসম্মত শিক্ষা মানুষের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অন্যতম প্রধান উপায়। এটি মানুষকে শুধু পুথিগত জ্ঞানে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং তার মধ্যে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং নতুন কিছু উদ্ভাবনের সামর্থ্য গড়ে তোলে।

দ্বিতীয়ত, একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, সহমর্মিতা, সহনশীলতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করে। এর মাধ্যমে তারা কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং সমাজের কল্যাণে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়।

তৃতীয়ত, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং, জাতীয় উন্নয়নের জন্য দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম, শিক্ষণপদ্ধতি এবং মূল্যায়নব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।

চতুর্থত, মানসম্মত শিক্ষা সামাজিক বৈষম্য হ্রাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে যখন সমাজের প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত জনগোষ্ঠী মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ লাভ করে, তখন তারা নিজেদের জীবনমান উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এভাবে শিক্ষা একটি শক্তিশালী সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যা ধীরে ধীরে সমাজে ন্যায়বিচার ও সমানাধিকার নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

এ ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা একটি দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সচেতন ও শিক্ষিত নাগরিকরা নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত থাকে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। তারা অন্যায়, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং একটি জবাবদিহিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। ফলে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলতে মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে শিক্ষার পরিমাণগত উন্নতি হলেও শিক্ষার মানোন্নয়ন হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা এখনো মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক, যা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়নের অভাব, দক্ষ শিক্ষকের স্বল্পতা, গবেষণার সীমিত সুযোগ এবং প্রযুক্তির অপর্যাপ্ত ব্যবহার—এসব কারণে কাঙ্ক্ষিত মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় শিক্ষা নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি চালু হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানের বৈষম্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

মানসম্মত শিক্ষা একটি জাতির আলোকিত ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। এটি কেবল ব্যক্তিগত উন্নয়নই নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করে। বিএনপি সরকার একটি জ্ঞানভিত্তিক আলোকিত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি সত্যিকার অর্থে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত করে তোলাই হবে সরকারের প্রধান দায়িত্ব। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে—এ উপলব্ধি থেকে সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একটি আলোকিত, সমৃদ্ধ ও জ্ঞাননির্ভর জাতি গঠনের উদ্যোগকে সফল করতে নাগরিকদেরও আন্তরিক হতে হবে এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে সঠিকভাবে দায়িত্বপালন করতে হবে।

লেখক: উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে : ইরানের প্রেসিডেন্ট

বল যখন ভেতরে ঢুকতে চায় না, তখন কোনোভাবেই ঢুকবে না : স্পেন কোচ

৫-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে কোচ বরখাস্ত করল তিউনিসিয়া

আর্মি আইবিএতে উৎসবমুখর পরিবেশে ‘ক্লাব ডে-২০২৬’ অনুষ্ঠিত

দুধ দিয়ে গোসল করে প্রেম ছাড়ার শপথ দুই প্রবাসীর

‘এটি আমাদের দল নয়’— ইরানের বিশ্বকাপ ম্যাচ ঘিরে বিক্ষোভে উত্তাল লস অ্যাঞ্জেলেস

দুর্দান্ত গোলে ইরানের বিপক্ষে এগিয়ে গেল নিউজিল্যান্ড

অর্থের অভাবে মাকে মাঠে এনে খেলা দেখাতে পারিনি : কেপ ভার্দের নায়ক ভোজিনিয়া

অতিমানবীয় ৯ সেভ, নিশ্চিত হারের হাত থেকে উরুগুয়েকে বাঁচালেন আরাউহো

সব ধর্ষণই সমান অপরাধ, প্রতিটির বিচার নিশ্চিত করতে হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১০

সৌদি আরবের বিপক্ষে সমতা ফেরাল উরুগুয়ে

১১

আত্মঘাতী গোলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয় হাতছাড়া মিসরের

১২

আত্মঘাতী গোলে সমতায় ফিরল বেলজিয়াম

১৩

৬০ বছরে এই প্রথম! বিশ্বকাপে বিরল ঘটনার জন্ম দিলেন স্পেনের তারকা ফরোয়ার্ড

১৪

কে এই ভোজিনহা? স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ নায়ক

১৫

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় নারায়ণগঞ্জে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা

১৬

দূরপাল্লার নিখুঁত শটে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মিসরের লিড

১৭

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, নাকি সংকটের পূর্বাভাস

১৮

এভাবেও হৃদয় জয়ের গল্প লেখা যায়

১৯

স্পেনকে রুখে দেওয়া কেপ ভার্দে আসলে কেমন দেশ?

২০
X