

মেক্সিকোর বিপক্ষেও জোড়া গোল করেছিলেন জুড বেলিংহাম। তবে সেদিন গোল পেয়েছিলেন হ্যারি কেনও। শনিবার ফের জোড়া গোল করেছেন বেলিংহাম। এবার কিন্তু হ্যারি কেন টিমটিম করে জ্বলছিল। ইংল্যান্ড আলোকিত হয়েছে বেলিংহামের হাজার ভোল্টের আলোয়।
মিয়ামি গার্ডেন্সের ভারী, আর্দ্র বাতাসে এই ম্যাচের বড় একটা সময় যেন তিনটি আলাদা শক্তি নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমেছিল। প্রথমত, নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা নরওয়ে—যারা হৃদয়, দক্ষতা ও ধৈর্য নিয়ে খেলেছে এবং জুড বেলিংহামের প্রভাব বাদ দিলে তারাই সম্ভবত ভালো দল ছিল। দ্বিতীয় শক্তি ছিল জুলাইয়ের ফ্লোরিডার দমবন্ধ করা গরম, যা মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে ফেলে। আর সেই আবহাওয়ার কাছে ইংল্যান্ডকে অন্য যে কোনো দলের চেয়ে বেশি অসহায় মনে হচ্ছিল। ম্যাচের দীর্ঘ সময় তারা শুধু এলোমেলো বা বিভ্রান্তই ছিল না, যেন সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে পড়েছিল। জলাভূমির পাশে শুকাতে দেওয়া সাদা জার্সির মতো নিস্তেজ ও প্রাণহীন লাগছিল ইংল্যান্ডকে। কখনো কখনো মনে হচ্ছিল, এ যেন সেই চেনা ইংল্যান্ড—অপেক্ষমাণ, নিষ্প্রভ, যেন খেলা নিজেরাই তৈরি করতে পারে না। তাদের কাছে ফুটবল যেন ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ হয়ে আসার গল্প। তবে ইংল্যান্ড দলে একজন জুড বেলিংহাম ছিলেন। তিনি যেন এই দলের অন্য সবার থেকে আলাদা এক প্রজাতির ফুটবলার। যেন তিনি এক টুর্নামেন্ট খেলছেন, আর বাকিদেরও টেনে নিয়ে যাচ্ছেন সেই স্রোতে। শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, বেলিংহামের লড়াই শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়, নিজের দলের অবক্ষয় আর প্রকৃতির বিরুদ্ধেও। মনে হচ্ছিল তিনি একাই বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন, সূর্যের দাপটকেও যেন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের ২-১ জয়ের দুই গোলই করলেন তিনি। দুটি গোলই ছিল শরীর ছুড়ে দিয়ে করা দারুণ ফিনিশ। আর ম্যাচজুড়ে হার মানতে অস্বীকার করে নিজের ক্লান্ত সতীর্থদের মধ্যে শক্তি আর বিশ্বাস ছড়িয়ে দিয়েছেন। দুই গোলই এসেছে ঠিক তখন, যখন নরওয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলেছিল। বিশেষ করে প্রথমার্ধের শেষদিকে, ইংল্যান্ড ১-০ গোলে পিছিয়ে। দীর্ঘ সময় বল দখলে রেখেও কোনো কার্যকর আক্রমণ গড়তে পারেননি তারা, যেন ম্যাচটাকে হারিয়ে দিচ্ছিল আবহাওয়াই। সমতাসূচক গোলটি ছিল ম্যাচে ইংল্যান্ডের প্রথম শট। ডান দিক থেকে বাঁ দিকে বেলিংহ্যামের পরিচিত তির্যক দৌড়, এলিয়ট অ্যান্ডারসনের নিখুঁত পাস, আর নরওয়ের ডিফেন্ডারদের মুহূর্তের দ্বিধা—সেই ক্ষুদ্র সময়টুকুই যথেষ্ট ছিল। আরেক পা এগিয়ে জোরালো শটে বল পাঠালেন দূরের কোণে, গোলরক্ষক ওরিয়ান হাস্কিওল্ড নিল্যান্ডের নাগালের বাইরে। গোল দেখে কারও লেখার ইচ্ছা হতেই পারে যে, সবাই পরিকল্পনা করে মাঠে নামে। কিন্তু পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে, যখন সামনে থাকেন জুড বেলিংহাম। এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ১০ নম্বর জার্সিধারীর গোলসংখ্যা দাঁড়াল ছয়ে। তিনি এ দলের সবচেয়ে বড় ভরসা, যে দল এখনো মাঝেমধ্যেই ভেঙে পড়ে। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রতিপক্ষকে কাটাতে পারেন, মুহূর্তের মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন, ঝুঁকি নিতে জানেন। তাকে দেখে দিয়েগো ম্যারাডোনার একক নায়কোচিত বিশ্বকাপ অভিযানের সঙ্গে তুলনা করার প্রলোভন আসবে। কিন্তু সেটা ঠিক হবে না। এত ত্রুটিপূর্ণ দলে এমন গল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তব হয় না। বেলিংহাম ইংল্যান্ডকে উদ্ধার করেছেন, বদলে দেননি। শুরুর দিকে ইংল্যান্ড বল নিয়ন্ত্রণ করলেও ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়ে। বেলিংহামের কিছু সুন্দর টার্ন, কিছু ঝলক ছিল মন ভোলানো। তবু ফুটে উঠছিল ইংল্যান্ডের বড় দুর্বলতা—সৃজনশীলতার অভাব এবং ঘন রক্ষণ ভাঙার অক্ষমতা। এখন ইংল্যান্ডের গন্তব্য আটলান্টা, যেখানে সেমিফাইনালে অপেক্ষা করছে আর্জেন্টিনা। টুখেলদের এখনো অনেক কিছু ঠিক করা বাকি। এই দল যেন কৌশলের চেয়ে বেশি এগিয়েছে আবেগ, জেদ আর ১০ নম্বর জার্সিধারী এক অসাধারণ ফুটবলারের স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিভার ওপর ভর করে। জুড বেলিংহাম একা ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারবেন না। ফ্রান্স ও স্পেনেরও দুর্দান্ত খেলোয়াড় আছে, আর তাদের দলগত কাঠামো অনেক বেশি পরিণত। তবে সেসব আলোচনা পরে হবে। আপাতত নরওয়ে, মিয়ামি, আর সেই কোয়ার্টার ফাইনাল—যেখানে বাতাসও যেন ইংল্যান্ডকে পায়ের গোড়ালি ধরে টেনে নামাতে চাইছিল—সেটিই হয়ে থাক এই দলের নিজস্ব এক উজ্জ্বল দিনের স্মৃতিচিহ্ন।