

প্রায় ৩৫ বছর পর আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন। রাকসু নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে, তেমনি নির্বাচনী মাঠে বেশ জোরালো উপস্থিতি নিয়ে নামছে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাকসু নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার রাকসুতে ভিন্নধর্মী কৌশল ও প্রচার গ্রহণ করেছে এ দুই শক্তি।
কৌশলী ও বৈচিত্র্যময় প্যানেল নিয়ে মাঠে ছাত্রদল: গত ৭ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাকসুর ২৩টি পদে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করে ছাত্রদল। এবারের প্যানেলে তারা ক্লিন ইমেজধারী, ‘নির্যাতিত’ এবং বহুমাত্রিক পরিচয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দিয়েছে। এতে রয়েছেন জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড়, রাজশাহী ফুটবল দলের গোলকিপার, ব্যান্ড সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, ডিনস পুরস্কারজয়ী শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী ও জনপ্রিয় সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
প্যানেলে শীর্ষ তিন পদের মধ্যে একটি এবং মোট চারটি পদে নারী প্রার্থী রাখা হয়েছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিশেষ করে ভিপি প্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবীর তার নম্র স্বভাব, সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখ এবং ইতিবাচক ছাত্র নেতৃত্বের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছেন। জিএস পদে আছেন নাফিউল জীবন, যিনি ছাত্রলীগের হাতে বারবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এজিএস পদে জাহিন বিশ্বাস এষা একজন বলিষ্ঠ নারী কণ্ঠ এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ, যিনি নারী ভোটারদের মনোযোগ কৌশলে টানছেন।
প্রথম বর্ষের ভোটে এগিয়ে ছাত্রদল: রাকসু নির্বাচনে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির দাবি ছাত্রদল দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছিল। আন্দোলনের ফলেই এবার ৪ হাজার ৩০৭ জন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এই ভোটারদের মাঝে ছাত্রদলের প্যানেল বেশ গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন অনেকে। কয়েকজন শিক্ষার্থী স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা ভোট দেবেন ছাত্রদল প্যানেলকেই।
শিক্ষার্থী আবু মোস্তফা হাসান বলেন, ‘ছাত্রদল আন্দোলন করেছে বলেই আমরা ভোটার হতে পেরেছি। তাই আমাদের ভোটের সবচেয়ে উপযুক্ত দাবিদার তারাই।’
জিএস প্রার্থী নাফিউল জীবন বলেন, ‘ডাকসু ও জাকসুর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আমরা শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনের পথেই হাঁটছি। শান্তিপূর্ণ প্রচার, সমস্যার সমাধানের পরিকল্পনা ও বৈচিত্র্যময় নেতৃত্বই আমাদের শক্তি।’
ভিপি প্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবীর বলেন, ‘রাকসুর প্রেক্ষাপট আলাদা। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষার্থীদের আস্থা নিয়েই আমরা বিজয়ী হবো।’
শক্তিশালী প্যানেল নিয়ে ‘বাজিমাত’ করতে চায় ছাত্রশিবির: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্রশিবিরের প্রভাবাধীন বলে পরিচিত। তবে এবারের নির্বাচনে ছাত্রশিবির ভিন্ন পথে হেঁটেছে। ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ নামে একটি বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল গঠন করে তারা চমক দিয়েছে। এখানে শুধু ভিপি পদে রয়েছেন রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। বাকি পদগুলোতে নানা সংগঠন, শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
জিএস পদে রয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা, এজিএস পদে ‘সোচ্চার স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক’-এর সভাপতি সালমান সাব্বির। প্যানেলে আছেন তিনজন নারী শিক্ষার্থী—ছাত্রী সংস্থার সভানেত্রী সাইয়্যেদা হাফসাসহ আরও দুজন। সহ-সমাজসেবা সম্পাদক পদেও নারী প্রার্থী রয়েছেন। নির্বাহী সদস্য পদে আছেন একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে চোখ হারানো দ্বীপ মাহবুবকেও প্যানেলে রেখেছে শিবির।
এই বৈচিত্র্যকে শিবির নেতৃত্বের অন্যতম কৌশল বলা হচ্ছে। তারা প্রচারে ছাত্রদলের মতো আক্রমণাত্মক না হয়ে শিবিরের স্বভাবসুলভ বিনয়ী আচরণ, আতর বিতরণ, মুড়ি পার্টি এবং সাংস্কৃতিক উপায়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন।
সংস্কৃতিতে সৃজনশীল প্রচার, গানে গানে শিবিরের ইশতেহার: শিবির প্যানেলের সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক প্রার্থী জাহিদ হাসান জোহা এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন প্রচারে। গম্ভীরা গানের সুরে কখনো কৃষক, কখনো শিক্ষক, কখনো গায়ক সেজে ক্যাম্পাস মাতিয়ে তুলছেন তিনি। গানে গানে শিবিরের ইশতেহার শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরছেন। এটি শিবিরের অন্যতম সৃজনশীল প্রচার হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছে।
নারী ও ‘নিজস্ব ভোট’ শিবিরের বড় ফ্যাক্টর: বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের অনুমিত ‘নিজস্ব ভোট’ রয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার। তা ছাড়া ছাত্রী সংস্থার কারণে ছয়টি নারী হলের ভোটারদের বড় একটি অংশ শিবিরের দিকে থাকতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ হাজার ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশ আবাসিক হলে থাকেন, বাকি ৬০ শতাংশ আশপাশে—যেখানে শিবিরের সামাজিক প্রভাবও দীর্ঘদিনের।
শিবিরের ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘ডাকসু, জাকসু ও রাকসুর প্রেক্ষাপট আলাদা। শিক্ষার্থীরা পরিবর্তন চায়—সৎ, যোগ্য ও সাহসী নেতৃত্ব চায়। আমাদের লক্ষ্য, একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক শিক্ষাঙ্গন গড়া, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, দমন নয়। সবাইকে নিয়েই এগোতে চাই আমরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নয়—এটি সব শিক্ষার্থীর। আমরা সবাইকে শ্রদ্ধা করি, অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’