

খুলনায় একসময়কার শান্ত শহর আজ সহিংসতা ও আতঙ্কে কাঁপছে। সাম্প্রতিককালে সহিংসতা, হত্যা ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রশাসনেরও।
খুলনা শহর এবং আশপাশের এলাকায় গত কয়েক মাসে সংঘটিত একের পর এক গুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও এর বাজার দখলকে কেন্দ্র করে এ সহিংসতা বাড়ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ।
গত রোববার সন্ধ্যায় সোনাডাঙ্গা করিমনগর এলাকায় নিজ বাসায় ঢুকে আলাউদ্দিন মৃধা (৩৫) নামে এক যুবককে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৩টি মামলা চলমান রয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ।
তার স্ত্রী নার্গিস অভিযোগ করেন, কারামুক্তির পর আলাউদ্দিন মাদক ছেড়ে দিনমজুরের কাজ করছিল। একরাম, মিন্টু ও ইয়াসিন নামের কয়েকজন তাকে পুনরায় মাদক কারবারে যুক্ত করতে চাইলে সে রাজি হয়নি। এরপরই তাকে হত্যা করা হয়।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) রাশিদুল ইসলাম বলেন, এটি মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষের অংশ হতে পারে, তবে তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, ৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত খুলনায় ৪৯টি হত্যা মামলা হয়েছে, যা আগের এক বছরের তুলনায় প্রায়
দ্বিগুণ। এসব মামলায় দেড় শতাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়া ১৫ জন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, রাইফেল, পাইপগানসহ প্রায় ৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, খুলনায় অন্তত ছয়টি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গ্রুপ মাসে ৭০ থেকে ১০০ কোটি টাকার মাদক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে ‘গ্রেনেড বাবু’ নামে পরিচিত রনি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে বড় অংশ। তার বাহিনীতে রয়েছে প্রায় ৫০০ সদস্য। গ্রেনেড বাবুসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশ জানিয়েছে, খুন, অস্ত্রধারণ ও মাদকের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত এসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয়দের সহায়তা না থাকায় অপরাধীদের ধরা কঠিন হয়ে পড়ে।
মাদক-অস্ত্র সিন্ডিকেট নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও, এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে রাজনৈতিক ছায়া থাকার অভিযোগও উঠেছে। অতীতে মাদক নিয়ন্ত্রণে খুলনার আলোচিত কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম গোয়েন্দা তালিকায় থাকলেও, তারা প্রায় কেউই আইনের আওতায় আসেননি।
খুলনার একটি সময়কার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা জেডএ মাহমুদ ডন, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতা এবং জেলা পর্যায়ের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার নাম একাধিকবার মাদকসংশ্লিষ্টতায় উঠে এসেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার মতে, ৫ আগস্ট ক্ষমতা পরিবর্তনের পর এই গডফাদারদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন। এর ফলে নিচতলার মাদক কারবারিরা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
শুধু মাদককে কেন্দ্র করেই অন্তত ২০টি খুন হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ, যার মধ্যে ১২টি মামলার আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।
এদিকে অস্ত্রের সহজলভ্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত এক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায় ৩০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে। তবে পুলিশের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, অনেক অস্ত্রই নকল বা অকেজো, আবার অনেক আসামির কাছ থেকে যে অস্ত্র উদ্ধারের দাবি করা হয়েছে, তা সঠিক কি না—তা যাচাই করা হয়নি।
পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্ত এলাকা কাছাকাছি হওয়ায় ভারত থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে এসব অস্ত্র দেশে ঢুকছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার রাশিদুল ইসলাম বলেন, বেশিরভাগ অস্ত্র মেড ইন ইন্ডিয়া। এগুলো মাদক সিন্ডিকেট ও কিশোর গ্যাংয়ের হাতে চলে যাচ্ছে। তিনি জানান, এসব অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চলছে। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন, এ অস্ত্রের কারণে জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের সহিংসতা হবে না।
এদিকে খুলনার রূপসা থানায় গত দুই মাসেই পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার মধ্যে চারটি গুলি করে এবং একটি কুপিয়ে। সব ঘটনায় মাদকসংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
মহেশ্বরপাশা এলাকায়ও সম্প্রতি একের পর এক সহিংসতা চলছে। স্থানীয় সন্ত্রাসী হুমায়ুন কবির ওরফে হুমা জামিনে বেরিয়ে এসে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় হয়েছে। অস্ত্রের মহড়া, বাড়িতে গুলিবর্ষণসহ একাধিক ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) তাজুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে।
পুলিশ কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, ‘এসব হত্যাকাণ্ডে পেশাদার অপরাধী জড়িত। তারা দ্রুত পালিয়ে যায়, তবু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চলছে। স্থানীয় মানুষ সহযোগিতা না করলে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।’
এ বাস্তবতায় খুলনায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মাদক ও অস্ত্রের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এলাকাবাসী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজ।