

গাজীপুরে চোর অপবাদ দিয়ে একটি পোশাক কারখানার শ্রমিককে রশি দিয়ে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত শনিবার ভোরের দিকে কোনাবাড়ীর গ্রিনল্যান্ড লিমিটেড নামের কারখানায় ওই ঘটনা ঘটে। নিহত শ্রমিক হৃদয় (১৯) টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শুকতার বাইদ গ্রামের আবুল কালামের ছেলে। তিনি কারখানাটিতে মেকানিক্যাল মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। এ ঘটনায় হাসান মাহমুদ মিঠুন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার ভোরের দিকে চোর অপবাদ দিয়ে গ্রিনল্যান্ড গার্মেন্টসের মেকানিক সেকশন ও নিরাপত্তা কর্মীরা হৃদয়ের হাত-পা বেঁধে একটি কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে রশি দিয়ে বেঁধে নির্মমভাবে পেটানো হয়। তাদের নির্যাতনে দুপুরের দিকে হৃদয় মারা যান। ঘটনার খবর আশপাশের অন্যান্য গার্মেন্টসে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে ৪০০-৫০০ শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসে এবং গ্রিনল্যান্ড গার্মেন্টসের সামনে গিয়ে কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে হৃদয় হত্যার বিচার দাবি করেন। এ সময় তারা কয়েক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখেন। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হত্যাকাণ্ডের পর কর্তৃপক্ষ গার্মেন্টসের মূল ফটকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের নোটিশ সাঁটিয়ে পালিয়ে যায়।
সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, গত শুক্রবার রাত ২টার দিকে কিছু লোক হৃদয়কে দড়ি দিয়ে হাত পিঠমোড়া করে বেঁধে কারখানার ভেতরে একটি কক্ষে নিয়ে যাচ্ছেন। শনিবার সকাল ১০টা ১৪ মিনিটে কারখানা ভেতরে একটি অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতে দেখা যায়। মৃত অবস্থায় হৃদয়কে নিয়ে ১০টা ২১ মিনিটে অ্যাম্বুলেন্সটি কারখানা ত্যাগ করে।
সিসিটিভি ফুটেজ ছাড়াও হৃদয়ের একাধিক ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ১ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হৃদয়কে কারখানার একটি কক্ষের জানালার সঙ্গে রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে খালি গায়ে একটি সোফার ওপর বসিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে হৃদয়ের মুখ ও নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। তার জিনসের প্যান্টেও রক্তের দাগ লেগে ছিল। এ সময় আশপাশের কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘এত করে পিটানো হইছে, (তারপরও) কিছুই হয় নাই, মরে নাই।’
ভিডিওর আরেকটি অংশে দেখা যায়, হৃদয়কে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় একটি কক্ষ থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করছেন কয়েকজন। তাদের মধ্যে একজনের হাতে কাঠের লাঠি ছিল। তখনো পিঠের দিকে হাত মুড়িয়ে মাঝে লাঠি জুড়ে রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ছিলেন হৃদয়। রশির একটি অংশ দিয়ে তার দুই পা–ও বাঁধা ছিল। ওই অবস্থায় কয়েকজন তাকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন; কিন্তু হৃদয় ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছিলেন না।
স্থানীয়দের ধারণা, কারখানার ভেতরে নির্যাতনের তার মৃত্যু হওয়ার পর বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষ তাকে আহত দেখিয়ে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে রেজিস্ট্রারে তাকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরে পুলিশ মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে স্থানান্তর করে।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই লিটন বাদী হয়ে কোনাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় পুলিশ হাসান মাহমুদ মিঠুন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেন। মিঠুন টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী থানার হাদিরা বাজার এলাকার মফিজ উদ্দিনের ছেলে। তিনি গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থানাধীন কুদ্দুস নগর এলাকায় আয়নালের বাড়ির ভাড়াটিয়া।
কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের কাছে খবর আসে একজন চোর ফ্যাক্টরির দেয়াল টপকে ভেতরে আসার সময় ড্রেনে পরে আহত হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, ওই ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রকৃত ঘটনা শোনার পর কারখানায় অভিযান চালিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ এবং হত্যায় ব্যবহৃত অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আমরা নিশ্চিত হই এটি হত্যাকাণ্ড।’
ওসি আরও বলেন, ‘গত শুক্রবার রাত ২টার পরে কারখানার ভেতরে হৃদয়কে নির্যাতন করার ফুটেজ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, রাতেই হৃদয় মারা যান। পরে ঘটনা ধামাচাপা দিতে শনিবারে সকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে হৃদয়ের লাশ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে কারখানার সবাই পালিয়ে যান। পরে স্থানীয়রা ঘটনা জানতে পেরে বিক্ষোভ করেন।’