

স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচির (এইচএনপিএসপি) আওতায় অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) জনবলের পদ বিলুপ্ত করেছে সরকার। ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয় চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচির আওতাধীন ওপি। এরপর তৎকালীন সরকার নতুন করে আর ওপি চালু করেনি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে সেটি বাতিল করে দেয়। এরপর থেকে ৩৮ ওপির জনবল হয়ে পড়ে অলস। নিজেদের মর্জিমাফিক অফিস করতেন; মাঠ পরিদর্শনের নামে ঘুরে বেরিয়েছেন বিভিন্ন জেলায়; সেমিনারের নামে বিদেশেও অংশ নিয়েছেন কেউ কেউ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একাধিকবার চিঠি দিয়েও তাদের নিয়মিত অফিসে হাজির করাতে ব্যর্থ হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ওপি বাতিলের ৮ মাসের বেশি সময় পর জনবলের পদবিও বিলুপ্ত করা হয়েছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সেবা বিভাগের উপসচিব ফাতিমা-তুজ-জোহরা সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সেক্টর কর্মসূচিভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রমের অবসান হওয়ায় ওপি পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত পদবি লাইন ডাইরেক্টর (এলডি), প্রোগ্রাম ম্যানেজার (পিএম) এবং ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (ডিপিএম) এবং অন্যান্য পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। সেইসঙ্গে বিলুপ্ত পদগুলোতে কর্মরত জনবলকে দ্রুত পদায়নের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৮ সালের আগে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতোই বিষয়ভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হতো। তাতে আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় ১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মতো ১২৬টি প্রকল্প একীভূত করে ১৯৯৮-২০০৩ সালে পাঁচ বছর মেয়াদে এইচপিএসপি শীর্ষক প্রথম সেক্টর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে। বাতিল হতে যাওয়া পঞ্চম সেক্টর কর্মসূচিতে ৩৮টি ওপি রয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ২৩টি এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ১৫টি। এ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। বহুজাতিক ঋণদাতাদের অর্থায়নে এই কর্মসূচি চালু করা হলেও ২৭ বছর পর গত ফেব্রুয়ারিতে এই কার্যক্রম বাতিল করে সরকার। এর ৮ মাস পর গত রোববার ওপির জনবলের পদও বিলুপ্ত করা হয়।
এদিকে ২০১৭ সালে শুরু হয় চতুর্থ সেক্টরভিত্তিক কর্মসূচি। ২০২২ সালে এই কর্মসূচির মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। তবে কিছু কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং কিছু অব্যয়িত অর্থও রয়ে যায়। সেই টাকা পুনরায় ব্যবহারের জন্য সরকার ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি (নো কস্ট এক্সটেনশন) নীতির আওতায় ওপির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ায়। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া খাতভিত্তিক পদ্ধতি অনুসারে এটি বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। ২০২৪ সালের জুনে চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচির ওপির মেয়দ শেষ হয়; কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওপি অনুমোদন হয়নি। ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পঞ্চম সেক্টর কর্মসূচির অধীনে ৩৮টি ওপির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করেছিল। বর্তমান সরকারও ওপি অনুমোদন না করে বাতিল করে দেয়। এর আগে গত ১৫ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. শেখ ছাইদুল হক সই করা এক অফিস আদেশে লাইন ডাইরেক্টর, প্রোগ্রাম ম্যানেজার এবং ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজাররা নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকা এবং কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে প্রশিক্ষণসহ সেমিনারে অংশগ্রহণ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিজ নিজ দপ্তরে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করে অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দপ্তরে অবহিত করার কথা বলা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. রিজওয়ানুর রহমান বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে ওপির জনবল ন্যস্ত করেছিল। মন্ত্রণালয়ের আদেশে সেই পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। নতুন করে মন্ত্রণালয়ের থেকেই ওপির জনবল পদায়ন করা হবে। তিনি বলেন, নতুন করে সিদ্ধান্ত হবে তাদের কীভাবে পদায়ন করা হবে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব সাইদুর রহমান বলেন, ওপি জনবলের পদ বিলুপ্তের পর যার সঙ্গে যেটা ম্যাচ করবে, সেভাবেই তাকে পদায়ন করা হবে। লাইন ডাইরেক্টর, ডেপুটি ডাইরেক্টর এবং প্রোগ্রাম ম্যানেজারদের মন্ত্রণালয় থেকে পদায়ন করা হবে। মেডিকেল অফিসারদের অধিদপ্তর থেকে পদায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, সব জনবলকে এখনই অধিদপ্তর থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে না। কারণ কিছু কাজ এখনো চলমান। এসব কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য ওপির পদবি পরিবর্তন করা হবে। লাইন ডাইরেক্টর থেকে ডাইরেক্টর হিসেবে সংযুক্তিতে কাজ করবে। লাইন শব্দটা থাকবে না।