

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা (এমপি) একদিকে যেমন মাঠঘাট চষে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন ধন্যবাদ জানাতে, পাশাপাশি প্রস্তুতি নিচ্ছেন সংসদ অধিবেশনে যোগদানের। এরই মধ্যে বগুড়া-৬ আসনে উপনির্বাচন এবং শেরপুর-৩ আসনে সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, ওই দুই আসনে ভোটগ্রহণ হবে আগামী ৯ এপ্রিল। এই দুই আসনের নির্বাচনে অংশ নিতে এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছেড়ে দেওয়ায় শূন্য হওয়া বগুড়ার আসনটিতে জামায়াত তাদের আগের প্রার্থীকেই রাখছে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেতে মুখিয়ে আছেন দলের অর্ধডজন নেতা। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুতে নির্বাচন বাতিল হওয়া শেরপুর-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোচনায় রয়েছেন দলটির একাধিক নেতা। আর বিএনপি থেকে প্রার্থিতার আলোচনায় একাধিক নেতার নাম এলেও প্রার্থী পরিবর্তনের কেন্দ্র থেকে এখনো কোনো ইঙ্গিত মেলেনি।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের সাধারণ নির্বাচন এবং বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণের তারিখ ঘোষণা করেন। ঘোষিত তফশিল অনুযায়ী এ দুটি আসনে ভোটগ্রহণ হবে আগামী ৯ এপ্রিল। এদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২ মার্চ। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ৫ মার্চ পর্যন্ত। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করা যাবে ৬ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১১ মার্চ। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৪ মার্চ। প্রতীক বরাদ্দ হবে ১৫ মার্চ।
এই দুই আসনের গণভোট প্রসঙ্গে ইসি সচিব বলেন, একটিতে (বগুড়া-৬) আগে গণভোট হয়েছে। শেরপুর-৩ আসনে গণভোটের প্রয়োজন হচ্ছে না। গণভোটের ফলে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের যে পার্থক্য রয়েছে, তাতে এ আসনে গণভোট না করলেও অসুবিধা নেই।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছেড়ে দেওয়ায় শূন্য হওয়া বগুড়া-৬ আসনে হবে উপনির্বাচন। আর প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে বাতিল হয় শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন। এর মধ্যে বগুড়া-৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে অধ্যক্ষ আবিদুর রহমানকে। তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৯৭ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়ে পরাজিত হন। তারেক রহমান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুটি আসনেই জয় পান। ফলে তাকে একটি আসন ছেড়ে দিতে হয়। এতে বগুড়া-৬ আসনটি শূন্য ঘোষিত হয়। সেই আসনে জামায়াত তাদের পূর্বনির্ধারিত প্রার্থীকেই রাখছে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে মুখিয়ে আছেন দলটির অন্তত অর্ধডজন নেতা। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্যও।
বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডেভোকেট একেএম মাহবুবুর রহমান, কৃষক দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ভিপি সাইফুল ইসলাম এবং বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘বগুড়া-৬ আসনের উপর্নিবাচনে প্রার্থী হতে অনেকেই চেষ্টা করছেন। স্থানীয় পর্যায়েও নানান আলোচনা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো দলীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তপশিল ঘোষণাার পর কেন্দ্র থেকে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।’
শেরপুর-৩ আসন: শেরপুর-৩ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধিন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী মো. নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুর পর ওই আসনের নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়। এই আসনেও ৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণ হবে। এখানে দলের প্রার্থী কে হবেন সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি জামায়াতে ইসলামী। আর জামায়াতের প্রার্থীর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল। তার বিপরীতে নতুন কাউকে কোনো প্রচারণা চালাতে দেখা যায়নি। ফলে স্থানীয়দের ধারণা, মাহমুদুল হক রুবেলকেই প্রার্থী করতে পারে বিএনপি। দলের একটি সূত্র বলছে, নতুন সরকার গঠনের পর বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত তারা পাননি।
তবে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা নূরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুর পর এই আসনে জামায়াতের কারা প্রার্থী হচ্ছেন এ ব্যাপারে জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে নিশ্চিত না করলেও বেশকিছু অসমর্থিত সূত্রে কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে তিনজন আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন। তারা হলেন নির্বাচন চলাকালে মৃত্যু হওয়া প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের ভাই সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদুজ্জামান মাসুদ, বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে নিহত রেজাউল করিমের স্ত্রী মারজিয়া আক্তার ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ।
এ ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের মজলিসে শূরা সদস্য ও কলাবাগান পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত আমির মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের মজলিসে শূরা সদস্য ও হাতিরঝিল পশ্চিম থানার সেক্রেটারি মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদের নামও উঠে এসেছে।
এ ব্যাপারে শেরপুর জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘তপশিল ঘোষণার খবর মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারলাম। বিষয়টা আমরা কেন্দ্রে এরই মধ্যে জানিয়েছি। আমরা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো সিদ্ধান্ত নিই না। আমাদের কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রার্থী হয় না। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তাকে নিয়েই আমরা নির্বাচনে লড়ব। তবে আমাদের নির্বাচনের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে।’
বগুড়া-৬ উপনির্বাচন ও শেরপুর-৩ নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব যুবায়ের কালবেলাকে বলেন, ‘বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে অধ্যক্ষ আবিদুর রহমানই থাকতে পারেন। আর শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন পরিচালনা সমন্বয়কসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে তালিকা চাওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায় থেকে তালিকা আসার পর তা যাচাই-বাছাই করে প্রার্থী চূড়ান্ত করবে কেন্দ্রীয় কমিটি। এ সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।’
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান গতকাল দুপুরে কালবেলাকে বলেন, ‘নির্বাচনের শিডিউল (তপশিল) মাত্রই ঘোষণা করা হলো। আমরা দলের নির্ধারিত ফোরামে বৈঠক করে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচন ও শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।’