কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০১ জুন ২০২৬, ১১:০২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

অবিক্রীত ২২ লাখের বেশি পশু, ক্রেতার চেয়ে গরু বেশি

লোকসানে খামারি
অবিক্রীত ২২ লাখের বেশি পশু, ক্রেতার চেয়ে গরু বেশি

কোরবানির ঈদকে ঘিরে সারা দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক গরু রাজধানীর হাটগুলোয় এলেও প্রত্যাশিত ক্রেতা পাননি অনেক খামারি, কৃষক ও ব্যাপারী। বাজারে পশুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকায় শেষ মুহূর্তে দরপতন হয়। ফলে অনেকে লোকসান করে কমদামে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। আবার অনেক পশু অবিক্রীত থাকায় বাড়ি নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন ব্যাপারীরা। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এবার কোরবানির সংখ্যাও কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যে কারণে পশুর চাহিদা কম থাকায় লোকসান গুনতে হয়েছে খামারি, কৃষক ও ব্যাপারীদের।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। এর মধ্যে ১ কোটির কিছু বেশি পশু কোরবানি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ ২২ থেকে ২৩ লাখ পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে।

খামারি ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বড় গরুর চাহিদা কম থাকা এবং সীমান্ত দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে গরু আসায় বাজারে এমন ধস নেমেছে। এর সঙ্গে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও কাদাময় হাট পরিস্থিতি পশু বিক্রিকে আরও কঠিন করে তোলে। এবার সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন বড় গরুর খামারিরা। রাজধানীর বাজারে বড় গরু নিয়ে আসা অনেকেরই ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ গরু অবিক্রীত থেকে গেছে। কেউ কেউ প্রতি গরুতে লাখ টাকার বেশি ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে গরুর দাম কমে যাওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে স্বস্তি ছিল। অনেকেই বলেছেন, ঈদের আগের দিনের তুলনায় গরুর দাম লাখে প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমেছে।

ঈদের দিন বৃহস্পতিবার সকালে গাবতলী হাট ঘুরে দেখা যায়, একের পর এক ট্রাকে অবিক্রীত গরু উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বিক্রেতারা। কেউ আবার ট্রাক না পেয়ে হাটজুড়ে পরিবহনের খোঁজ করছেন।

বগুড়া সদর থেকে গাবতলী হাটে ২৫টি গরু এনেছিলেন মাহবুব হোসেন। বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র ১৭টি। তিনি বলেন, ‘সব গরুই বড় ছিল। সবগুলোই লোকসানে বিক্রি করেছি। যে গরুর পেছনে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, সেটাই ঢাকায় এনে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে।’

মানিকগঞ্জ থেকে আসা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ লাভলু বলেন, ‘৪৪টি গরু এনেছিলাম। বিক্রি করতে পেরেছি মাত্র ১৩টি। বাকি গরু ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এবার আমরা গরুর সঙ্গে নিজেরাও কোরবানি হয়ে গেছি।’

আরেক ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘৪০টি গরুর মধ্যে ২০টি বিক্রি হয়নি। ঈদের দুই দিন আগে যে গরুর দাম ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা বলা হয়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। ঋণ করে গরু কিনেছি। টাকা পরিশোধ করতে হবে বলেই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।’

দিনাজপুর থেকে ৮০টি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছিলেন ব্যবসায়ী মামুন। চারটি ট্রাকে করে গরু আনার ভাড়া গুনতে হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। সঙ্গে ছিলেন ১১ জন শ্রমিক।

মামুন বলেন, ‘খাওয়া-দাওয়া, গোসল, টয়লেট—সবকিছুর জন্য টাকা লাগে। এখানে শুধু খরচই হয়েছে, লাভ হয়নি। ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত কোনো গরু বিক্রি করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে এখন গরু বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি।’

কুষ্টিয়া থেকে ৩০টি গরু নিয়ে কমলাপুর অস্থায়ী পশুর হাটে এসেছিলেন সোহেল আলী। ১০ জন মিলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তারা।

সোহেল আলী বলেন, ‘৩০টা গরুর মধ্যে মাত্র দুটি বিক্রি করতে পেরেছি। বাকি ২৮টা আবার গ্রামে নিয়ে গেছেন। গরু ফিরিয়ে নিতে শুধু ট্রাক ভাড়াই লেগেছে ৩৩ হাজার টাকা।’

কুষ্টিয়ার মিরপুর থেকে চারটি গরু নিয়ে আসা আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘দুটি গরু বিক্রি করে এরই মধ্যে ১ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বাকি দুটি গরুর দাম ক্রেতারা বলছেন ১ লাখ টাকা করে, অথচ কেনা হয়েছে দেড় লাখ টাকা দিয়ে। এভাবে বিক্রি করলে পুরো পুঁজি শেষ হয়ে যাবে। তাই গরু ফিরিয়ে নিচ্ছি।’

মানিকগঞ্জ, পাবনা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও যশোরসহ বিভিন্ন এলাকার খামারি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা ছিল তুলনামূলক বেশি।

বাজারে বড় গরুর ক্রেতা কম থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বড় খামারিরা। অনেক খামারি বলেছেন, ঢাকায় এসে থাকা, খাওয়ানো, শ্রমিক খরচ, হাটের খরচ—সব মিলিয়ে কয়েক লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। এখন অবিক্রীত গরু নিয়ে আবার খামারে ফিরে যাওয়ায় খাদ্য ও রক্ষণাবেক্ষণের চাপ আরও বাড়বে।

খামারিদের আশঙ্কা, আগের ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে না পারলে নতুন ঋণও পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে গোখাদ্যের দাম এখনো অনেক বেশি।

ক্রেতা মোহাম্মদ ফারদিন বলেন, ‘যে গরুর দাম ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল, সেটি ২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় কিনেছি।’

আরেক ক্রেতা সাহেদ বলেন, ‘ঈদের আগের দিন থেকেই গরুর দাম কমতে শুরু করে। এতে সাধারণ ক্রেতারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।’

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি নিলয় হোসেন বলেন, ‘মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। ফলে কম কোরবানি হয়েছে। বড় গরুর বাজার প্রায় ভেঙে পড়েছে। দেশের ৯৮ শতাংশ কোরবানিতে ছোট গরু ব্যবহৃত হয়। এগুলোর মূল উৎপাদক প্রান্তিক খামারি। বড় করপোরেট খামারগুলোর উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় তারা ছোট গরু উৎপাদনে যায় না।’ তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক কৃষক নিজের বাড়িতে গরু পালন করেন, তাদের খরচ কম। কিন্তু বড় খামারের খরচ অনেক বেশি। এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বড় খামারগুলো।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান বলেন, ‘এখনো কোরবানি হওয়া পশুর চূড়ান্ত হিসাব প্রস্তুত হয়নি। মাঠপর্যায় থেকে তথ্য আসছে। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর কোরবানি নির্ভর করে। এবার হয়তো কোরবানি কিছুটা বেশি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত হিসাব না আসা পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

অবিক্রীত পশু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুধু কোরবানির সময় পশু থাকবে, তারপর সারা বছর সংকট থাকবে—এটা হওয়া উচিত নয়। কিছু উদ্বৃত্ত থাকলে সারা বছর বাজারে সরবরাহ বজায় থাকে।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শুরুতেই ধাক্কা, হেক্সা মিশন সফল করতে পারবে ব্রাজিল?

জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল

চাকরির ইন্টারভিউতে বেতনের প্রশ্নের উত্তর দেবেন যেভাবে

বিশ্বকাপে ৯২ বছরের রেকর্ড অক্ষুণ্ন রাখল ব্রাজিল

মাস শেষে টাকা থাকে না? মধ্যবিত্তের ৭ সাধারণ ভুল

হাইভোল্টেজ ম্যাচে ব্রাজিলকে জিততে দিল না মরক্কো

ছুটির আবেদন মঞ্জুর করানোর বিশেষ ৮ কৌশল

শেষ পর্যন্ত ‘পল্টি’ই মারলেন সাকিব

আজকের নামাজের সময়সূচি

জার্সি পরে নামাজ পড়া কি বৈধ?

১০

ব্রাজিল-মরক্কোর শেয়ানে শেয়ানে টক্কর

১১

ব্রাজিলকে সমতায় ফেরালেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র

১২

ব্রাজিলের জালে গোল মরক্কোর

১৩

মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের শুরুর একাদশে আছেন যারা

১৪

শেষ মুহূর্তের গোলে সুইসদের জয় বঞ্চিত করে কাতারের ইতিহাস

১৫

এখনো বিয়েই করিনি, গণঅধিকারের কিছু নেতা গুজব ছড়াচ্ছেন : মনিরা শারমিন

১৬

এমবোলোর সফল স্পট-কিকে এগিয়ে সুইজারল্যান্ড

১৭

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয়ে ২ কোটি বোনাস পাচ্ছেন মিরাজরা

১৮

‘এগিয়ে চলো ব্রাজিল’, হুঙ্কার ছুড়লেন নেইমার

১৯

ভারতের বোলারদের পিটিয়ে গুরবাজের ৪৮ বলে সেঞ্চুরি

২০
X