

কাতার বিশ্বকাপের সময়ই বলা হচ্ছিল—ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ফুরিয়ে গেছেন। বিতর্ক দূরে ঠেলে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে ধরে রেখেছেন পর্তুগিজ তারকা। ডি আর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগাল আটকে গেছে, প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি রোনালদো। পুরোনো বিতর্ক ফের সামনে এলো—ছন্দ পাবে পর্তুগাল, চেনা রূপে ফিরবেন ৪১ বছর বয়সী তারকা!
কোচ রবার্তো মার্তিনেজের সামনে যে সংকট, ঠিক একই সংকটে পড়েছিলেন পূর্বসূরি ফার্নান্দো সান্তোসও। কাতারে গ্রুপ পর্বের পর সান্তোস শেষমেশ রোনালদোকে বেঞ্চে বসিয়ে দিয়েছিলেন। মার্তিনেজ এখন পর্যন্ত সেই পথে হাঁটেননি। ক্রমেই চাপ বাড়তে থাকা এই কোচ পিঠ বাঁচাতে হয়তো পূর্বসূরির পথেই হাঁটেন কি না—সময়ই বলতে পারে।
রোনালদোর মাথায় অবসর সংক্রান্ত ভাবনা নেই। কোচ মার্তিনেজ বর্ষীয়ান ফুটবলারকে দলে ডেকেছেন বারবার, ঠিক যেভাবে সান্তোসও ডেকেছিলেন। যে কারণে চার বছর পর ফের সেই একই মঞ্চে, একই বিতর্কের ঢেউ উঠল। পর্তুগালের স্প্যানিশ কোচকে ফুটবলের অন্যতম ভদ্র মানুষ হিসেবে ধরা হয়। রোনালদোকে নিয়ে বারবার প্রশ্নের মুখে তিনি কিছুটা বিনয়ী, রক্ষণাত্মক।
২০২৪ সালের ইউরোর আগে রোনালদোর নিয়মিত খেলার প্রশ্নে মার্তিনেজ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন— ‘আপনি কি জানেন, গত মৌসুমে আল নাসরের হয়ে ক্রিশ্চিয়ানো কত মিনিট খেলেছেন?’ সাংবাদিক জানান, প্রতিটি ম্যাচেই তিনি শুরু থেকে ছিলেন। মার্তিনেজ হাসি দিলেন, ‘আপনি নিজেই উত্তর দিয়ে দিলেন।’ সেই যাত্রায় চাপমুক্ত হলেও বিশ্বকাপ এই কোচকে নতুন বাস্তবতার মুখে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেটা প্রকট হচ্ছে সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড ড্যানি ওয়েলব্যাকের কথায়, ‘রোনালদো ইংল্যান্ডে জন্মালে কোনোভাবেই বর্তমান বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পেত না।’ পরিসংখ্যান দিয়ে সেই চাপ সংবরণের চেষ্টা করছেন রবার্তো মার্তিনেজ, ‘আল নাসরের হয়ে গত মৌসুমে ৩৭ ম্যাচে ৩০ গোল, আগের মৌসুমে ৪১ ম্যাচে ৩৫ গোল। জাতীয় দলের শেষ ৩০ ম্যাচে ২৫ গোল করা একজন খেলোয়াড়কে পাওয়া কোচের জন্য উপহারের মতো।’
রোনালদো ২০২৪-২৫ নেশনস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন এবং পর্তুগাল সেই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালে এবং স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালেও তিনি গোল করেছিলেন। সেই একই রোনালদো যে কোনো সময় জ্বলে উঠতে পারেন। রবার্তো মার্তিনেজের মতো দেশটির সমর্থকরাও হয়তো খুব করে চাচ্ছেন রোনালদো তার পুরোনো রূপে ফিরে আসুক।
কঙ্গোর বিপক্ষে মাত্র ২৯ স্পর্শ, তিন শট, লক্ষ্যে ছিল না একটিও। সাবেক আর্সেনাল স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরি সরাসরি সমালোচনায় বলেন, ‘ব্রুনো ফার্নান্দেস ভালো পজিশনে থাকার পরও রোনালদো নিজেই শট নিয়েছেন। দলের গোল দরকার, তোমার একার গোল নয়।’ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে রোনালদোর সাবেক সতীর্থ পল স্কোলস আরও কঠোর ভাষায় বলেন, ‘৪১ বছরের একজন খেলোয়াড় মাঠে শুধু একটি পজিশনেই শুরু করতে পারেন—গোলকিপার।’
পর্তুগালের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি, রোনালদো বিতর্ক দলের মনোযোগ ভেঙে দিতে পারে। এমন একটি দলের, যাদের মিডফিল্ড এই বিশ্বকাপে সম্ভবত সেরা। যারা শিরোপার অন্যতম দাবিদারও। কিন্তু প্রথম ম্যাচে পর্তুগালের শ্রেষ্ঠত্ব কাগজ-কলমের হিসাবেই আটকে ছিল। এমন পরিস্থিতির জন্য দলটি প্রস্তুত ছিল বলেই জানালেন ফুলব্যাক দিওগো দালোত। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এ ফুটবলার বললেন, ‘বিশ্বকাপের আগেই আমরা এ মুহূর্তগুলোর জন্য নিজেদের তৈরি করেছিলাম। দলটা অটল—এই বার্তাই আমরা পাঠাতে চেয়েছি। ভালো দিক হলো, সমস্যাটা তাড়াতাড়ি এলো। যত তাড়াতাড়ি আসে, তত তাড়াতাড়ি পেছনে ফেলা যায়।’
যে সমস্যার জন্য দল প্রস্তুত ছিল, সেটা এসেছিল কঙ্গোর বিপক্ষে দলের প্রথম ম্যাচে। উজবেকিস্তনের বিপক্ষে দলগত প্রচেষ্টা দিয়ে পর্তুগাল হয়তো সমাধান খুঁজে নেবে। কিন্তু রোনালদো এই ম্যাচেও নিজের ছায়া হয়ে থাকলে বিতর্কের পালে নতুন হাওয়া লাগবে—৪১ বছর বয়সী এই ফুটবলার এখন দলের বোঝা!