

কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত রাজধানীসহ সারা দেশের দোকান মালিকরা। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া অঝোর বৃষ্টিতে স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর। বিশেষ করে রাজধানীর বড় বাণিজ্যিক এলাকাগুলোয় পানি ঢুকে পড়ায় অচল হয়ে পড়ে সেখানকার মার্কেট, শপিংমল ও বিপণিবিতানগুলো। এতে ব্যবসায় বড় লোকসান গুণতে হয় ব্যবসায়ীদের। আয়শূন্য দিন কেটেছে অনেকের। শুধু তাই নয়, আটকে পড়া বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়েছে তাদের বিপুল পরিমাণ মালপত্র।
গত শনি থেকে সোমবার পর্যন্ত জলাবদ্ধতার কবলে ছিল রাজধানীর নিউমার্কেট, কারওয়ান বাজার, মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকা। গতকাল নিউমার্কেট এলাকার পানি নেমে গেলেও আগের তিন দিন জলাবদ্ধতার কারণে নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট, নূরজাহান মার্কেট ও এলিফ্যান্ট রোডের ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সে সময় মার্কেটের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে নিচতলার দোকানগুলোয় পানি ঢুকে পড়ায় দোকানের মালপত্র রক্ষায় হিমশিম খেতে হয় ব্যবসায়ীদের। একপর্যায়ে গত রোববার নিউমার্কেটের সব দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কেটের বিদ্যুৎ সংযোগও সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়। প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিউ সুপার মার্কেট ও বনলতা বাজারসহ অন্যান্য মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।
নিউমার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী মো. হিরন ও মো. আজিম মাতবর জানান, টানা বৃষ্টিপাত হলেই এ এলাকায় পানি জমে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের। শুধু দুর্ভোগ নয়, আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। দোকানের জিনিসপত্রেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়। এক দিন ব্যবসা বন্ধ থাকলে অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার লোকসান হয় বলে জানান তারা।
নিউ সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, এক দিনের বৃষ্টিতেই নিউ সুপার মার্কেট, বনলতা বাজারের রাস্তাঘাটে পানি জমে যায়। দোকানেও পানি ঢুকে যায়। এবার টানা বর্ষণে ব্যবসা ও মালপত্র দুটোরই ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
দেশের দোকান মালিকদের দুই সংগঠন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি। সংগঠনগুলো বলছে, টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সারা দেশের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের ধস নেমেছে। শুধু বিক্রিতে মন্দা নয়, দোকানের ভেতর পানি ঢুকে কাপড়, ইলেকট্রনিক্স ও অন্যান্য মূল্যবান মালপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে ফুটপাতের ক্ষুদ্র
ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের অনেকেরই পুঁজি বলতে যা ছিল, তা বৃষ্টির পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, এবার ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এর প্রভাব আরও কিছু সময় থাকবে। গত শনি থেকে সোমবার—এ তিন দিনে সারা দেশে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৪৫ শতাংশ বিক্রি কমেছে। এই ধসের কারণে সারা দেশে দোকান ব্যবসায়ীদের ৭০০ কোটি টাকার বেশি ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে। কেবল রাজধানীতেই এ ক্ষতির পরিমাণ ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ মালপত্রেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করলেও কোনো সুবিধা পান না। প্রতি বছর জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু সমাধান করা হচ্ছে না। ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনসহ কর্তৃপক্ষগুলোর অবহেলা ও উদাসীনতাই দায়ী। তাদের মধ্যে নেই কোনো সমন্বয়। নেই কোনো জবাবদিহি।
বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুর রহমান টিপু বলেন, আমাদের দেশে রাস্তা কেবল উঁচু করা হয়, কিন্তু বৃষ্টির পানি পরিচালনার সুব্যবস্থা নেই। এতে রাস্তার পাশের মার্কেট ও দোকানগুলো নিচে পড়ে যায় এবং টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়। তিনি আরও বলেন, শুধু সদিচ্ছার অভাবে প্রতি বছর ব্যবসায়ীদের এভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এর প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়ছে। জলাবদ্ধতা কেটে গেলেও তার প্রভাব থেকে যায় দীর্ঘসময়। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খেতে হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যায়।
নীলক্ষেত মোড়ের ফুটপাত ব্যবসায়ী মো. ইমাম হোসেন বলেন, আমরা দিন আনি দিন খাই। জলাবদ্ধতার কারণে আয়-রোজগার শূন্য দিন গেছে। এ কয়েকদিনের ব্যবসার ক্ষতিতে অনেক খানি পিছিয়ে গেছি। একই কথা বললেন, মিরপুর ১০-এর ফুটপাত ব্যবসায়ী শেখ নাসিমও।
এবারের জলাবদ্ধতায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদেরও দুদর্শায় দিন কেটেছে। এখানকার সবজি ব্যবসায়ী বিলাল হোসেন ও রাজু মিয়া জানান, বৃষ্টির পানিতে গত কয়েকদিন বাজার এলাকা সয়লাব হয়ে যাওয়ায় পচনশীল পণ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যেখানে প্রতিদিন ভোরে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতেন তারা। সেখানে ২০ হাজার টাকাও বিক্রি করতে কষ্ট হয়েছে তাদের। শুধু তাই নয়, বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ায় শাকপাতা, ধনেপাতা, টমেটো ও কাঁচামরিচের মতো পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাখ লাখ টাকার কাঁচা পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
মিরপুর-১০ ও গুলিস্তান এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দার সঙ্গে দোকানের ভেতর পানি ঢুকে কাপড়, ইলেকট্রনিক্স ও অন্যান্য মূল্যবান মালপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিপুল ক্ষতির মুখোমুখি ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের অনেকেরই পুঁজি বলতে যা ছিল, তা বৃষ্টির পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে।
গুলিস্তানের পাইকারি ও খুচরা উভয় বিক্রেতারা জানান, গত শনি থেকে সোমবার পর্যন্ত কোনো ব্যবসাই হয়নি তাদের। ঢাকা ট্রেড সেন্টার মার্কেটের গেঞ্জি ও শার্টের পাইকারি বিক্রেতা মো. দুলাল হোসেন জানান, বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ১ টাকাও আয় হয়নি আমাদের। উল্টো যেসব মার্কেটের বেজমেন্টে মালপত্র ছিল, সেখানে লাখ টাকার মালপত্র নষ্ট হয়েছে অনেকের।