

ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর গভীরে শিলার আকস্মিক সরে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট এক তীব্র ও দ্রুত কম্পন। এই কম্পন শুধু মাটিকেই কাঁপিয়ে তোলে না—এর সঙ্গে ঘটতে পারে অগ্নিকাণ্ড, সুনামি, ভূমিধস কিংবা তুষারধসের মতো ভয়াবহ বিপর্যয়।
ভূমিকম্প যে কোনো সময়, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আঘাত হানতে পারে। যে কোনো জায়গায় ভূমিকম্প হতে পারে, তবে কিছু অঞ্চলে এর সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি। কিছু অঞ্চল রয়েছে যেগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আপনি যে এলাকায় বাস করেন, সেটি ভূমিকম্পপ্রবণ কি না, জেনে নেওয়াই আপনার সচেতনতার প্রথম ধাপ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই হঠাৎ আঘাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রস্তুত থাকার গুরুত্ব—নিজের, পরিবারের এবং আশপাশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য।
ড্রপ, কভার ও হোল্ড অন—ভূমিকম্পে বাঁচার সহজ অনুশীলন
ভূমিকম্পের সময় নিজেকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ড্রপ (Drop), কভার (Cover) ও হোল্ড অন (Hold On) অনুশীলনটি ঠিকভাবে করা। পরিবারের সবাইকে নিয়ে এ অনুশীলনটি করলে জরুরি মুহূর্তে কেউই আতঙ্কিত হবে না এবং সবাই জানবে ঠিক কী করতে হবে। অনুশীলনটি করতে যা করবেন—
ড্রপ: যেখানে আছেন সেখানেই নিচে বসে পড়ুন। দুই হাত ও হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে নিচু হয়ে বসুন। এই ভঙ্গি আপনাকে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করবে এবং প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে দ্রুত সরে যাওয়ার সুযোগ দেবে।
কভার: মাথা ও ঘাড় ঢেকে সুরক্ষিত হন। আপনার হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখুন। যদি কাছে কোনো শক্ত টেবিল বা ডেস্ক থাকে, তার নিচে চলে যান। যদি আশপাশে নিরাপদ কিছু না থাকে, তাহলে জানালা থেকে দূরে কোনো অভ্যন্তরীণ দেয়ালের পাশে গিয়ে হাঁটু মুড়ে ঝুঁকে বসে পড়ুন। এই ভঙ্গি ভেঙে পড়া বস্তু বা ধ্বংসাবশেষ থেকে আপনাকে সুরক্ষা দেবে।
হোল্ড অন: কম্পন থামা পর্যন্ত অবস্থান ধরে রাখুন। যদি টেবিল বা ডেস্কের নিচে থাকেন, সেটিকে শক্ত করে ধরে রাখুন, কারণ কম্পনের সময় এটি নড়াচড়া করতে পারে। যদি কোনো সুরক্ষিত আসবাবের নিচে না থাকেন, তাহলে দুই হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখুন এবং অবস্থানটি ধরে রাখুন।
চোট এড়াতে নিজের ঘর করুন নিরাপদ
ভূমিকম্পের সময় আঘাত লাগার সবচেয়ে বড় কারণ হলো আশপাশের জিনিসপত্র পড়ে যাওয়া। তাই ঘর নিরাপদ রাখতে আগে থেকেই কিছু প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
কোন কোন জিনিস পড়ে যেতে পারে—ভাবুন একবার। ভাবুন, আপনার ঘরটিকে যদি ওপর-নিচ বা দিক-দিক করে ঝাঁকানো হয়—কোন জিনিসগুলো পড়ে গিয়ে আপনাকে আঘাত করতে পারে? যেমন—টেলিভিশন, দেয়ালের তাক, আয়না ও ছবি, বুকশেলফ, ফ্রিজ, গিজার বা ওয়াটার হিটার ও বড় আকারের আলমারি। এ ধরনের ভারী ও ঝুঁকিপূর্ণ জিনিসগুলো ঠিকভাবে স্ট্র্যাপ, হুক, ল্যাচ বা অন্যান্য সেফটি ডিভাইস ব্যবহার করে সুরক্ষিত করে রাখুন, যাতে ভূমিকম্পের সময় এগুলো পড়ে গিয়ে ক্ষতির কারণ না হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকলে অতিরিক্ত সতর্কতা
আপনি যদি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় থাকেন, তবে আপনার ভবনটি বিশেষজ্ঞ দিয়ে মূল্যায়ন করিয়ে নিতে পারেন। প্রয়োজন হলে কাঠামোগত শক্তি বৃদ্ধির কথাও ভাবতে হবে।
ইন্স্যুরেন্স বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণ গৃহবীমা বা ভাড়াটিয়া বীমায় ভূমিকম্পজনিত ক্ষতি সাধারণত কভার করা হয় না। তাই আলাদা ভূমিকম্প বীমা আছে কি না, তা বীমা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে জেনে নেওয়া উচিত।
সংযুক্ত থাকুন—দুর্যোগে নিরাপত্তার প্রথম ধাপ
ভূমিকম্পের সময় যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। তাই আগে থেকেই কিছু প্রস্তুতি নিন।
যা যা প্রস্তুত রাখবেন
আপনার মোবাইল চার্জ দেওয়ার জন্য ব্যাকআপ ব্যাটারি বা বিকল্প চার্জিং ব্যবস্থা রাখুন।
ব্যাটারিচালিত রেডিও রাখুন, যাতে বিদ্যুৎ না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ খবর জানতে পারেন।
একটি পার্সোনাল সাপোর্ট টিম তৈরি করুন—যাদের আপনি সাহায্য করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে তারা আপনাকে সহায়তা করবে।
জরুরি দক্ষতা শিখুন—নিজের জন্য, অন্যের জন্য
ভূমিকম্পে আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বেশি হতে পারে আর তখন জরুরি সেবাও সবসময় পাওয়া নাও যেতে পারে। তাই কিছু মৌলিক দক্ষতা জানা অত্যন্ত জরুরি।
যেসব দক্ষতা আপনাকে প্রস্তুত রাখবে
ফার্স্ট এইড ও সিপিআর শিখে নিন। কারণ, বিপদের সময় আপনিই হতে পারেন কারও প্রথম সাহায্যদাতা। ঘরে থাকা গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ কীভাবে বন্ধ করতে হয়, তা জেনে রাখুন। একটি ফায়ার এক্সটিংগুইশার সংগ্রহ করুন এবং এটি সঠিকভাবে ব্যবহার করার কৌশল শিখে নিন। এমনভাবে প্রস্তুত থাকুন যেন কিছু সময় বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানি ছাড়াই জীবনযাপন করতে পারেন। সচেতনতাই দুর্যোগে সুরক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি—আজই প্রস্তুতি নিন, নিরাপদ থাকুন।
জরুরি সরঞ্জাম সংগ্রহ করুন
ভূমিকম্পের পর দোকানপাট বা ফার্মেসি বন্ধ থাকতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, ওষুধসহ জরুরি সরঞ্জাম আগে থেকেই গুছিয়ে রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। সহজ ব্যবস্থাপনার জন্য আপনার সরঞ্জামগুলো তিন ধরনের কিটে ভাগ করে রাখুন—
সঙ্গে নিয়ে বেরোনোর ব্যাগ
এ ব্যাগে কমপক্ষে তিন দিনের প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানি ও ওষুধ রাখুন। সঙ্গে রাখবেন মোবাইল ও অন্যান্য ডিভাইসের (যেমন: CPAP, হুইলচেয়ার ইত্যাদি) জন্য চার্জার ও ব্যাটারি। ব্যক্তিগত জরুরি সামগ্রী এটি এমন ব্যাগ হবে, যা জরুরি মুহূর্তে সহজেই কাঁধে তুলে নিয়ে বের হতে পারবেন।
বাড়িতে থাকার জরুরি মজুত
এই কিটে কমপক্ষে দুই সপ্তাহের খাবার, পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুত রাখুন। বিদ্যুৎ, পানি বা গ্যাস না থাকলেও যাতে কয়েক দিন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারেন—সেটাই এ কিটের উদ্দেশ্য।
ঘুমের সময়ের জরুরি ব্যাগ
এ ব্যাগটি বিছানার পাশে এমনভাবে রাখুন যাতে ভূমিকম্প রাতে ঘটলে দ্রুত হাতে পান। এতে রাখবেন পায়ের সুরক্ষায় স্টার্ডি জুতা (ভাঙা কাচে কাটা লাগা ভূমিকম্পের সবচেয়ে সাধারণ আঘাত), টর্চলাইট, চশমা, ডাস্ট
মাস্ক, হুইসেল। ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ায় যেন দ্রুত নিজের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো পেয়ে যান।
ওষুধ ও নথিপত্র নিরাপদে রাখুন
কমপক্ষে এক মাসের ওষুধ শিশু-নিরাপদ কনটেইনারে সংরক্ষণ করুন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী বা যন্ত্রপাতি হাতে রাখুন। ব্যক্তিগত, আর্থিক ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি নিরাপদে এবং সহজে পাওয়া যায় এমনভাবে রাখুন (হার্ডকপি বা নিরাপদ অনলাইন ব্যাকআপ)। ওষুধের নাম ও ডোজ লিখে একটি ছোট কার্ড পকেটে রাখলে সংকটে খুব কাজে লাগতে পারে।