

শুটিংয়ের ব্যস্ততা, লাইট-ক্যামেরার ঝলকানি আর পরিচালকের ‘অ্যাকশন’ ধ্বনি—এসবের মধ্যেই পাওয়া গেল তাকে। তিনি এ সময়ের দাপুটে অভিনেত্রী রুনা খান, যিনি বড় পর্দা আর ছোট পর্দা দুটিই সমানতালে মাতিয়ে রেখেছেন। সম্প্রতি ‘স্বপ্ন’ টেলিফিল্মের শুটিং সেটে বসে তার সঙ্গে কথা হলো। শফিকুর রহমান শান্তনুর লেখা ও আলমগীর হোসেন খন্দকার দুলালের পরিচালনায় এই টেলিফিল্মে তিনি আসছেন এক সংগ্রামী নারীর চরিত্রে।
যে চরিত্রে রুনা খানের ‘লোভ’!
কথোপকথনের শুরুতেই জানতে চাইলাম তার নতুন এই কাজ ‘স্বপ্ন’ নিয়ে। কী তার চরিত্র, কেমন এর গল্প?
উত্তরে রুনা খান যে গল্প শোনালেন, তা যেন আমাদের সমাজেরই এক চেনা চিত্র। তিনি বলেন, ‘এই যে আমাকে দেখছেন, এই চরিত্রের নাম সুফিয়া। মেয়েটির স্বামী বিদেশে থাকে। সচ্ছল পরিবারের গৃহবধূ সে। গল্পের একপর্যায়ে তার প্রবাসী স্বামীর মৃত্যু হয়। এরপর সুফিয়াকে সম্পত্তি ও বাড়ি থেকে বঞ্চিত করা হয়। যেন তার আর প্রয়োজন নেই।’
গল্পের গভীরতা বোঝাতে তিনি যোগ করেন, ‘তেমন পরিস্থিতিতে সুফিয়া তার পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সী কন্যাসন্তানকে নিয়ে ঢাকায় আসে। এরপর থেকেই মূলত এ টেলিফিল্মের গল্পের দৌড় শুরু হয়। একই সঙ্গে ঢাকার ভীষণ মানবিকতা ও অমানবিকতা, দুটিই আমরা এখানে দেখতে পাব। মসজিদের ইমাম থেকে রেস্তোরাঁর বাবুর্চির সহযোগিতায় কীভাবে এই মেয়েটি উঠে দাঁড়ায়, সেই গল্পটাই এখানে মূল বার্তা বহন করে।’
এ টেলিফিল্মে তার সঙ্গে আরও অভিনয় করছেন শক্তিমান অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবুসহ অনেকে।
রুনা খানকে আমরা বরাবরই ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে দেখি। সুফিয়ার মতো চরিত্রগুলোই কি তাকে বেশি টানে?
প্রশংসার সঙ্গে হাসিমুখেই স্বীকার করলেন তিনি। রুনা খানের কথায়, ‘একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমি বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে কাজ করতে চাই। এই বিভিন্ন রকম চরিত্রের মধ্যে যখন এমন কোনো চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পাই, যেই চরিত্রে আমাদের দেশের, মানুষের, সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়, সেরকম চরিত্রের প্রতি আমার ব্যক্তিগত লোভ বেশি জন্ম নেয়। সুফিয়াও ঠিক তেমন একটি চরিত্র।’
প্রবাসীদের প্রতি বিশেষ বার্তা!
‘স্বপ্ন’-এর গল্পে যেহেতু প্রবাসীর স্ত্রীর সংগ্রাম উঠে এসেছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই কথা উঠল প্রবাসীদের ত্যাগ ও বঞ্চনা নিয়ে। প্রবাসীরা অনেক কষ্ট করেও অনেক সময় দেশে সঠিক মূল্যায়ন পান না, পরিবারের কাছেও হন বঞ্চনার শিকার।
এ নিয়ে রুনা খান বেশ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের গণমাধ্যমের মারফত অনেক সময় দেখি, কোনো কোনো প্রবাসী তার স্ত্রীর কাছে টাকা পাঠাচ্ছে, কিন্তু তার বাবা-মা সেই টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার কখনো বাবা-মা বা ভাইয়ের নামে টাকা পাঠাচ্ছে, তার স্ত্রী-সন্তান বঞ্চিত হচ্ছে। এমন নানা রকমের গল্প আমরা জানি।’
এর সমাধান কী? রুনা খানের মতে, সচেতনতার বিকল্প নেই। ‘এখানে আসলে নিজেকে সচেতন করার থেকে বড় আর কিছু নেই। প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে আরও সচেতন করতে হবে। কোন খাতে কত টাকা খরচ করছে, কেন করছে, সেটা বুঝে যদি করা যায়, তাহলে হয়তো একটু রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।’
প্রবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের উপার্জনের টাকা দিয়ে আপনার সংসারের সঙ্গে সঙ্গে দেশেরও অনেক উপকার হচ্ছে, দেশ সমৃদ্ধ হচ্ছে। তাই আপনাদের জন্য সবসময় শুভ কামনা। আপনারা সবসময় সুখে থাকেন।’
নেতিবাচকতাকে না বলুন!
প্রযুক্তির ভালো-মন্দের প্রসঙ্গে আসতেই উঠে এলো সামাজিক মাধ্যমের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও সমালোচনার প্রসঙ্গ। একে এই অভিনেত্রী কীভাবে মোকাবিলা করেন? রুনা খানের উত্তর স্পষ্ট—তিনি নেতিবাচকতাকে জীবনে ঠাঁই
দেন না।
‘আমার সত্যি বলতে কাজের বাইরে কিছুই দেখা হয় না’,—বলছিলেন রুনা খান। ‘আমি একজন মডেল, অভিনেত্রী। এটুকু নিয়েই থাকতে পছন্দ করি। কোনো কাজ কারও ভালো লাগবে, কোনো কাজ একটু কম ভালো লাগবে। সেই মতামত তারা জানাতে পারেন। সেটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও নেতিবাচকতাকে আমি জীবনে ঠাঁই দিতে চাই না এবং আমার মনে হয় কারোরই ঠাঁই দেওয়া উচিত নং। কারণ, এগুলো যদি নিজের মনে ও মাথায় নিতে থাকি তাহলে কাজটা করব কখন?’
পর্দায় আসছে একের পর এক চমক!
কথায় কথায় জানা গেল তার বর্তমান ব্যস্ততার কথাও। রুনা খানের ঝুলিতে এখন একাধিক বড় প্রজেক্ট। দর্শকদের জন্য অপেক্ষা করছে দারুণ সব চমক।
তার অভিনীত তিনটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায় আছে: মাসুদ প্রতিকের ‘বক’, কৌশিক শঙ্কর দাসের ‘দাফন’, জাহিদ হোসেনের ‘লীলামন্থন’।
এ ছাড়া সোহেল রানা বয়াতির স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নিদ্রাসুর’-এর কাজ শেষ করেছেন। চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন আরও একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে। কথা চলছে আরও একটি সিনেমার।
এ টেলিফিল্মের মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর টেলিভিশনে ফিরছেন তিনি। সবশেষ মোস্তফা কামাল রাজের ‘ফ্যামিলি ক্রাইসিস’ ধারাবাহিকে দেখা গিয়েছিল তাকে। হাসিমুখেই বললেন, ‘অনেকদিন পর টেলিভিশনের জন্য কাজ করতে পেরে বেশ ভালো লাগছে।’
‘স্বপ্ন’ টেলিফিল্মটি সেই ভালো লাগারই এক নতুন প্রতিচ্ছবি হতে চলেছে, আর সেইসঙ্গে দর্শকরাও পেতে যাচ্ছেন সমাজের চেনা গল্পের এক শক্তিশালী আয়না।