

সিনেমার শুটিং শুরুর কিছুদিনের ভেতরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নায়ক-নায়িকার লুক, সেটের ছবি, কখনো আবার শুটিংয়ের দৃশ্যও। যেখানে সিনেমাটির টিজার, পোস্টারও প্রকাশ করা হয়নি। সেখানে প্রধান চরিত্রের লুক ও শুটিং ভিডিও লিক হওয়া বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এক ধরনের ‘স্বাভাবিক সংস্কৃতি’ হয়ে উঠেছে। আর এ স্বাভাবিক হয়ে ওঠাটাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।
একটি সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি তার চমক। দর্শক যখন প্রথমবার কোনো টিজার দেখে, ট্রেলারে নায়কের নতুন লুক দেখে বা বড় পর্দায় কোনো দৃশ্য আবিষ্কার করে—সে মুহূর্তে তৈরি হয় এক ধরনের উত্তেজনা ও বিস্ময়। এ বিস্ময়ই সিনেমার বিপণনের বড় হাতিয়ার। কিন্তু যদি সেই লুকই মুক্তির মাসখানেক আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়, তাহলে সে আবিষ্কারের আনন্দ কোথায় থাকে? দর্শক তখন আর নতুন কিছু দেখছে না; বরং আগেই দেখা জিনিসের পুনরাবৃত্তি দেখছে।
এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সিনেমা সংশ্লিষ্টদের বড় দুর্বলতা ও পেশাদারিত্বের অভাব।
একটি সিনেমা কোনো একক মানুষের কাজ নয়। এটি একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা। পরিচালক, প্রযোজক, কস্টিউম ডিজাইনার, মেকআপ আর্টিস্ট, সেট ডিজাইনার, লাইটিং টিম—সবাই মিলে তৈরি করেন একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পকর্ম। কিন্তু যখন এ টিমের ভেতর থেকে ছবি বা তথ্য বাইরে চলে আসে, তখন সেটি শুধু একটি সিনেমার ক্ষতি করে না; বরং পুরো প্রক্রিয়াটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশ্বের বড় চলচ্চিত্র শিল্পগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, সেখানে শুটিং সেট মানেই কঠোর নিয়ন্ত্রণ। মোবাইল ফোন ব্যবহারে বিধিনিষেধ থাকে, বাইরের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকে, অনেকক্ষেত্রে কর্মীদের গোপনীয়তা চুক্তিতে সই করতে হয়। কারণ তারা জানে একটি লুক, একটি দৃশ্য, এমনকি কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপও পুরো সিনেমার মার্কেটিং পরিকল্পনাকে ভেঙে দিতে পারে। অনেক নির্মাতা বছরের পর বছর ধরে তাদের প্রজেক্টকে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে রাখেন, শুধু দর্শকের সেই প্রথম দেখার বিস্ময় অক্ষুণ্ন রাখার জন্য।
অথচ ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বাস্তবতায় দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। এখানে ছবি লিক হওয়াকে অনেকেই গুরুত্বই দেন না। বরং কেউ কেউ এটিকে ‘মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি’ বলেও চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ ধরনের তথাকথিত মার্কেটিং আসলে দর্শকের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। যখন সিনেমার বড় বড় চমক আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন সিনেমা হলে গিয়ে নতুন কিছু পাওয়ার আকর্ষণটা নষ্ট হয়ে যায়।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পেছনে একটি বড় সমস্যা হলো অগোছালো কাজের সংস্কৃতি। কথা হচ্ছে, এ অগোছালো ব্যবস্থাকে কি চিরকাল মেনে নেবে? নাকি ধীরে ধীরে হলেও একটি পেশাদার সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করবে এটাই এখন ভাবার বিষয়। আজ যদি একটি ছবি লিক হয়, কাল হয়তো ভিডিও ফাঁস হবে, পরশু হয়তো পুরো দৃশ্যই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে। এ ধারা চলতে থাকলে একসময় এর মূল্য দিতে হবে পুরো ইন্ডাস্ট্রিকেই। নির্মাতা, প্রযোজক, শিল্পী—কেউই এর বাইরে থাকবেন না। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে দর্শকের সঙ্গে সিনেমার সেই বিশেষ সম্পর্কটির, যেখানে প্রতিটি দৃশ্য ছিল আবিষ্কারের আনন্দ।
ঢাকাই চলচ্চিত্রে প্রতিভার অভাব নেই। গল্প আছে, নতুন নির্মাতা আসছেন, তরুণ শিল্পীরা কাজ করছেন। সম্ভাবনাও আছে বিপুল। কিন্তু পেশাদারিত্বের জায়গায় ঘাটতি ইন্ডাস্ট্রিকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে। আর যদি এ জায়গাটিতে পরিবর্তন আনা না হয়, তাহলে এ ক্ষতি শুধু আজকের নয়—এটি আগামী দিনের সিনেমার ভবিষ্যতকেও বিপদের মুখে ঠেলে দেবে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে শাকিব খান ও সাবিলা নূর অভিনীত আসন্ন কোরবানি ঈদের সিনেমা ‘রকস্টার’-এর কিছু স্থির চিত্র। এর আগেও দম, সোলজার, মালিক সিনেমাগুলোর ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। এর মধ্যে দম সিনেমাটি এ ঈদে মুক্তি পেলেও, বাকি দুটি সিনেমা এখনো মুক্তি পায়নি। এ ছাড়া বড় তারকার ও বড় বাজেটের একাধিক সিনেমার ছবি ও শুটিং ভিডিও সাম্প্রতিক সময়ে হরহামেশাই ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।