

দীর্ঘদিনের নেপথ্য সাধনা, অবিচল নিষ্ঠা ও নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে অভিনয়শিল্পী মো. এরশাদ হাসান গড়ে তুলেছেন তার শিল্পীসত্তার দৃঢ় ভিত। শিল্পের পথে তার যাত্রা কখনো মঞ্চনাটকে, কখনো পথনাটকে, কখনো মূকাভিনয়ের নীরব ভাষায়। আবার কখনো বেতারের কণ্ঠনাট্যে, কখনো টেলিভিশনের পর্দায় চরিত্রাভিনয়ে, কখনো ফটোগ্রাফির সংবেদনশীল দৃষ্টিতে, কখনো বৃহৎ শিল্প প্রকল্পের সমন্বয়কের ভূমিকায়, বহুমাত্রিক শিল্পচর্চার মধ্য দিয়েই নিজেকে গড়ে তুলেছেন এক পরিণত, সংবেদনশীল ও পরিশীলিত শিল্পী হিসেবে। শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, ব্যক্তিজীবন ও নতুন নাটক নিয়ে কথা বলেছেন কালবেলার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রিয়েল তন্ময়
আপনার অভিনয়জীবনের শুরুটা কীভাবে? শৈশবেই কি শিল্পের প্রতি ঝোঁক ছিল?
অবশ্যই। ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতাম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একক অভিনয়ে পুরস্কার পাওয়ার পর অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর হয়। পরে ‘আলিফ লায়লা’র একটি চরিত্র মঞ্চে অভিনয় করে ব্যাপক উৎসাহ পাই। সেই সময়ই বুঝেছিলাম, অভিনয়ই হবে আমার পথ।
থিয়েটারের প্রতি আপনার গভীর আগ্রহ কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
জন্মস্থান পিরোজপুরের থাকাকালীন থিয়েটার দলের সঙ্গে যুক্ত থেকে নাটকের প্রকৃত সৌন্দর্যকে কাছে থেকে দেখেছি। পরে ঢাকায় এসে নাট্যনির্দেশক গোলাম সরোয়ারের সান্নিধ্যে থিয়েটারকে জীবনবোধ হিসেবে গ্রহণ করি। তার একটি কথা আজও মনে আছে— ‘ব্যতিক্রমী মানুষ হতে চাইলে থিয়েটারে যুক্ত হও।’ এরপর ২০০৬ সালে থিয়েটার স্কুল থেকে ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করে থিয়েটার নাট্যদলের সদস্য হিসেবে আমার ঢাকার নাট্যচর্চায় ব্যপক প্রসার ঘটেছে।
দীর্ঘ নাট্যজীবনে কোন কোন চরিত্র আপনার কাছে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে?
প্রতিটি চরিত্রই আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে। ‘মাধবী’, ‘মেরাজ ফকিরের মা’, ‘রুদ্র রবি ও জালিয়ানওয়ালাবাগ’, ‘মুক্তধারা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’—প্রতিটি নাটকে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছি। বিশেষ করে এক নাটকে তিনটি আলাদা চরিত্রে অভিনয় করা আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
মঞ্চ, টেলিভিশন, বেতার, মাইম—এতগুলো মাধ্যমে কাজ করেছেন। কোন মাধ্যম আপনাকে সবচেয়ে বেশি টানে?
আমার কাছে সব মাধ্যমই গুরুত্বপূর্ণ। মঞ্চ আমাকে শেকড় দিয়েছে, টেলিভিশন দিয়েছে জনপ্রিয়তা, বেতার শিখিয়েছে কণ্ঠের শক্তি আর মাইম শিখিয়েছে শব্দ ছাড়াই অনুভূতি প্রকাশ করতে। প্রতিটি মাধ্যমই আমাকে সমৃদ্ধ করেছে।
শুধু অভিনয় নয়, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা ও প্রযোজনা সমন্বয়েও আপনি কাজ করেছেন। এই অভিজ্ঞতা কতটা সমৃদ্ধ করেছে আপনাকে?
একজন শিল্পীর শুধু অভিনয় জানলেই হয় না। একটি প্রযোজনা সফল করতে পর্দার আড়ালের প্রতিটি মানুষের অবদান বোঝা জরুরি। প্রযোজনা সমন্বয়, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা ও সাংগঠনিক দায়িত্ব আমাকে আরও দায়িত্বশীল এবং পরিপূর্ণ শিল্পী হতে সাহায্য করেছে।
সম্প্রতি ‘ভাসানে উজান’ একক নাটকটি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এই কাজটি আপনার কাছে কতটা বিশেষ?
‘ভাসানে উজান’ আমার অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মঞ্চে একা পুরো একটি নাটক বহন করা সহজ নয়। চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েন, নীরবতা, আবেগ—সবকিছু দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া ছিল বড় দায়িত্ব। এই নাটকে আমার দীর্ঘ দুই দশকের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অভিনয়ের চেষ্টা করেছি। দর্শকের ভালোবাসাই এই পরিশ্রমকে সার্থক করেছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি লেখালেখি ও আলোকচিত্র নিয়েও কাজ করছেন। নতুন পরিকল্পনা কী?
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে একটি নাট্যগ্রন্থ এবং একটি কবিতার বই প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছি। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রকৃতি নিয়ে তোলা ছবিগুলো নিয়ে ‘আমার চোখে আমার বাংলা’ নামে একটি অ্যালবাম এবং একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীরও পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের জন্য আপনার বার্তা কী?
শিল্পকে শুধু পেশা হিসেবে নয়, জীবনবোধ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে, মানুষকে জানতে হবে, শৃঙ্খলা ও সততা বজায় রাখতে হবে। শিল্পে শর্টকাট বলে কিছু নেই। নিষ্ঠা, ধৈর্য আর নিরন্তর অনুশীলনই একজন শিল্পীকে দীর্ঘ পথচলার শক্তি দেয়।