

চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে শত বছরের চলাচলের রাস্তায় কাঁটাতারের বেঁড়া দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। এতে ১৭টি পরিবারের ২ শতাধিক নারী-পুরুষ ও স্কুল শিক্ষার্থী গৃহবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। উপজেলার সূচিপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের নরিংপুর নতুন মৃধা বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ওই বাড়ির তর্কিত ভূমির উপর দিয়ে প্রায় ১৭টি পরিবারের সদস্যরা শতাধিক বছর ধরে চলাচল করে আসছেন। বাড়ির লোকজন স্বাধীনভাবে চলাচল করে এলেও বাঁধসাধে পুরান মৃধা বাড়ির আবুল খায়েরের কন্যা মুকসুদা বেগম। এর আগেও কাঁটাতারের বেড়াটি উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে ৩ মাস আগে মুকসুদা বেগম স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয় কয়েক ব্যক্তির সহযোগিতায় পুনরায় চলাচলের পথ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে ওই পরিবারগুলোর সদস্যদের বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। অসুস্থ রোগী, স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও পুরুষ-মহিলারা নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে পথে প্রতিবন্ধকতার কারণে বাড়ির বের হতে পারছেন না। এ নিয়ে পুনরায় তাদের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তা বরাবর প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগের পরও অদ্যাবধি কোনো সুরাহা পায়নি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
অভিযোগকারী রশিদা বেগম বলেন, ‘এটি আমাদের বাড়ির দীর্ঘদিনের চলাচলের রাস্তা। আমাদের পুরান বাড়ির মুকসুদা সম্পত্তি ক্রয় করেছে দাবি করে জোরপূর্বক বাড়ির পথে স্থানীয় ইউপি সদস্য জাহাঙ্গীরসহ কয়েক লোক নিয়ে এসে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে দেয়। বাড়িতে বেশ কয়েকজন অসুস্থ ও অপারেশন করা রোগী রয়েছে। যাদের ডাক্তার দেখাতে পর্যন্ত বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। আমরা নিরুপায় হয়ে সমাজের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি।’
ভুক্তভোগী মানিক, মোজাম্মেল, সফিক ও কামাল হোসেন বলেন, বাড়ির পুরাতন রাস্তা কেউ কিনে নেওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও মুকসুদা ক্ষমতার দাপট ও মানুষকে মিথ্যা মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ এলাকার কিছু লোকের আশ্রয় প্রশ্রয়ে বারবার পথটি বন্ধ করে দিচ্ছে। প্রশাসনের মাধ্যমে ইতোপূর্বে পথটি অবমুক্ত করা হলেও ওই কুচক্রি মহলের সহযোগিতার কারণে পুনরায় রাস্তাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে ইউপি সদস্যের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয়েছে। তিনি আমাদের বাড়ির একজন বয়স্ক লোকের গায়ে হাত তুলেছেন।
তারা আরও বলেন, আমাদের বাড়িতে প্যারালাইজড রোগী, কিডনি অপারেশনের রোগীসহ বেশ কয়েকজন অসুস্থ মানুষ রাস্তা বন্ধের কারণে চিকিৎসা না পেয়ে মানবেতর জীপন যাপন করছে। বিগত ৩ মাস আমাদের কষ্ট কারও বিবেক ও মনকে নাড়া দিতে পারেনি। প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে অতীব জরুরি বিষয়টি নিয়ে পুরো বাড়ির লোক সমাধানের অপেক্ষা করছি। এখনও আমাদের দুর্ভোগ শেষ হয়নি।
স্কুল শিক্ষার্থী প্রিয়া আক্তার বলেন, এখন বৃষ্টির মৌসুম চলছে। বাড়ির পথ বন্ধ হওয়ায় গরুর ঘর ও টয়লেটের পাশ দিয়ে বাড়ি থেকে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে হয়। একদিকে কাদা, অন্যদিকে টয়লেটের গন্ধ নিয়েই স্কুলে আসা-যাওয়া করছি। তাছাড়া প্রতিদিন জামা-কাপড় নষ্ট করে স্কুলে যাওয়া ও বাড়িতে ফিরতে হয়। আমাদের কষ্ট দেখেও কেউ বাড়ির রাস্তাটি খুলে দিচ্ছে না।
বাড়ির বাসিন্দা ঝর্ণা আক্তার ও নারগিস বেগম বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। অপারেশন করার পর পুনরায় ডাক্তার দেখাতে কিংবা ড্রেসিং করার জন্য বাড়ি থেকে বের হতে পারছি না। বাড়িতে ডাক্তার ডেকে আনার পর একদিন এসে পথের এই অবস্থা দেখে দ্বিতীয়বার আসতে চায় না। বর্তমানে ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হতে না পারায় চিকিৎসা কষ্টে দিন পার করছি।
অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এটি আমার বিরুদ্ধে নিছক ষড়যন্ত্র। আমি স্থানীয় ইউপি সদস্য, জনগণের যে কোনো সমস্যা দেখা দিলে আমাকে ডাকলে যেতে হয়। আমি কারও প্রতিপক্ষ নই। অহেতুক ওই বাড়ির লোকজন আমার বিরুদ্ধে সংবাদকর্মীদের মিথ্যা তথ্য দিয়েছে।
মুকসুদা বেগম বলেন, আমি সম্পত্তির ক্রয়সূত্রে মালিক। পথঘাট বলতে কিছুই বুঝি না; আমার জায়গায় বেড়া দিব না কি করব- সেটা কাউকে বলার প্রয়োজন মনে করি না। সংবাদকর্মীরা তার অনুমতি না নিয়ে সেখানে কেন গিয়েছে সেজন্য তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও দেখে নেওয়ার হুমকি দেন মুকসুদা। দেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ, আইন-কানুন সবকিছু তার দেখা আছে, কেউ তার কিছুই করতে পারবে না বলেও তিনি বীরদর্পে বলেন।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিল্লোল চাকমা জানান, আমি বিষয়টি অবগত হয়েছি। ইতোপূর্বেও রাস্তাটি বন্ধ করার পর অবমুক্ত করা হয়েছে। পুনরায় পথ বন্ধ করায় ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার জন্য সরেজমিনে যাওয়া সম্ভব হয়নি। দ্রুতই ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।