

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত উপজেলায় শিশুসহ ১৬০ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, শনাক্ত হওয়া সবাই বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সময়মতো রোগ শনাক্ত এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। তবে দীর্ঘদিনের কাশি অবহেলা করা এবং রোগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যক্ষ্মা প্রতিরোধে শুধু ওষুধ সেবনই নয়, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাশি বা হাঁচির সময় রুমাল বা টিস্যু দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখা, প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার, প্রকাশ্যে কফ-থুতু না ফেলা, ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তবে বাস্তবে অনেক রোগী এসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া, সতর্কতা ছাড়াই জনসমাগমে চলাফেরা এবং যেখানে-সেখানে কফ-থুতু ফেলার কারণে যক্ষ্মার জীবাণু সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণে রোগী, পরিবার ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সচেতনতার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, ব্র্যাক ও আইসিডিডিআরবি সূত্রে জানা গেছে, যক্ষ্মা একটি সংক্রামক রোগ হলেও বর্তমানে এর কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বিনামূল্যে কফ পরীক্ষা, রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে রোগীরা সহজেই চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের দীর্ঘভূমি এলাকার বাসিন্দা মাজেদা খাতুন বলেন, দীর্ঘদিন কাশিতে ভুগলেও শুরুতে বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেলেও কোনো উপকার পাননি। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরীক্ষা করালে তার যক্ষ্মা ধরা পড়ে। বর্তমানে নিয়মিত ওষুধ সেবন করছেন এবং আগের তুলনায় অনেকটা সুস্থ রয়েছেন।
একই উপজেলার সাহেবাবাদ ইউনিয়নের পাঁচ বছরের শিশু আরিফুল ইসলামও কয়েক সপ্তাহ ধরে কাশিতে ভুগছিল। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার যক্ষ্মা শনাক্ত হয়।
আরিফুলের বাবা সুমন মিয়া বলেন, অনেক চিকিৎসা করিয়েও ছেলের কাশি কমছিল না। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে পরীক্ষার মাধ্যমে যক্ষ্মা ধরা পড়ে। চিকিৎসক নিয়মিত ওষুধ সেবন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
ব্র্যাকের প্রোগ্রাম অফিসার অনির্বাণ সরকার বলেন, দীর্ঘদিন কাশি, ওজন কমে যাওয়া, জ্বর কিংবা দুর্বলতার মতো লক্ষণকে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। ফলে রোগ শনাক্তে দেরি হয় এবং এ সময়ের মধ্যে একজন থেকে আরেকজনে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
তিনি জানান, স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগিতায় ব্র্যাক নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য যক্ষ্মা রোগী শনাক্তে কাজ করছে। এ কার্যক্রমে আইসিডিডিআরবিও সহযোগিতা করছে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শেখ হাসিবুর রেজা বলেন, ‘যক্ষ্মা এখন সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য রোগ। কেউ দুই সপ্তাহের বেশি কাশিতে ভুগলে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত। নিয়মিত ওষুধ সেবন ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে রোগীরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘যক্ষ্মা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্ত এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।’