

বাংলাদেশের মঞ্চনাটক দীর্ঘদিন ধরেই সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নাটকের বিষয়বস্তু, নির্মাণশৈলী এবং উপস্থাপনায় এসেছে নতুনত্ব। মঞ্চনাটকের নির্মাতা ও শিল্পীরা নতুন ভাবনা, নতুন ভাষা এবং ভিন্নধর্মী গল্প বলার মাধ্যমে নাট্যাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করছেন। সমকালীন সমাজ বাস্তবতা ও সৃজনশীল চিন্তার একটি শক্তিশালী প্রকাশ মাধ্যম হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন নাট্যদল মঞ্চে নিয়ে এসেছে বেশ কিছু নতুন নাটক, যা দর্শক ও নাট্য সমালোচকদের নজর কেড়েছে। সেই নতুন সৃষ্টিগুলোর মধ্য থেকে নির্বাচিত নাটক নিয়ে এবার আট দিনব্যাপী একটি বিশেষ নাট্যোৎসবের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগ। ‘নতুন নাটকের উৎসব’ শিরোনামের এই আয়োজন শুরু হচ্ছে আজ থেকে। এটি শেষ হবে ১৯ জুন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত এই উৎসব দেশের সমকালীন নাট্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উৎসবের প্রতিটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে। ১২ থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় দর্শকদের জন্য মঞ্চস্থ হবে একটি করে নাটক। ফলে আট দিনের এই আয়োজনে দর্শকরা সমকালীন নাট্যধারার বৈচিত্র্য, নতুন নির্দেশনা, অভিনয় ভঙ্গি এবং নাট্যভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
উদ্বোধনী দিনে প্রদর্শিত হবে ‘চোরের নাম চরনদা’ নাটকটি। এটি পরিবেশনায় রয়েছে দিনাজপুর নাট্য সমিতি। নির্দেশনা দিয়েছেন নয়ন বার্টেল। দ্বিতীয় দিন ১৩ জুন রয়েছে বান্দরবানের ইয়াং বংহুং থিয়েটারের নাটক ‘রিনা পুং’ ।এটি নির্দেশনা দিয়েছেন সিংয়ং ম্রো। ১৪ জুন প্রদর্শিত হবে দৃশ্যকাব্য নাট্যদলের প্রযোজনা ‘ইডিপাস’। গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের লেখা এ নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন হাবিব মাসুদ। ১৫ জুন প্রদর্শিত হবে হান্ট থিয়েটারের ‘ক্যাফে দ্য ভলতে’। নাটকটির মূল ভাবনা, গল্প ও নির্দেশনা দিয়েছেন ডায়না ম্যারিলিন চৌধুরী। ১৬ জুন মঞ্চস্থ হবে প্রাচ্যনাটের ‘ব্যতিক্রম ও নিয়ম’ নাটকটি। জার্মান নাট্যকার বার্টল্ট ব্রেখটের বিখ্যাত নাটক ‘দ্য এক্সসেপশন অ্যান্ড দ্য রুল’ নাটকটির অনুবাদ করেছেন শহীদুল মামুন এবং নির্দেশনা দিয়েছেন আজাদ আবুল কালাম। ১৭ জুন রয়েছে ঢাকা থিয়েটার মঞ্চস্থ করবে ফারুক আহমেদ নির্দেশিত প্রথম নাটক ‘রঙমহাল’। এটি রচনা করেছেন ড. রুবাইয়াৎ আহমেদ। ১৮ জুন থাকছে নাট্যায়ন সিলেটের নাটক ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’। নির্দেশনা দিয়েছেন মোস্তাক আহমেদ। উৎসবের শেষ দিন ১৯ জুন প্রদর্শিত হবে যশোরের শব্দ থিয়েটারের নাটক ‘দ্য গ্রেট স্মাগলার’। যার নির্দেশনায় রয়েছেন মাসউদ জামান।
এ ছাড়া প্রতিদিন নাটক প্রদর্শনীর আগে এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলের লবিতে সন্ধ্যা ৬ টা ৩০ মিনিটে থাকছে বাংলা নাটকের গান নিয়ে আয়োজন। অন্যদিকে, ১৫ থেকে ১৯ জুন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে উদীয়মান নাট্যনির্দেশকদের জন্য বিশেষ কর্মশালা ‘সমকালীন বিশ্ব বাস্তবতায় নাট্য সৃজন: দর্শন, নন্দ ও কৃৎকৌশল।’
নাটক শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজের নানা বাস্তবতা, মানুষের অনুভূতি এবং সময়ের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম। নতুন নাটকের উৎসব সেই অর্থে নবীন ও সমসাময়িক নাট্য নির্মাণকে দর্শকের সামনে উপস্থাপনের একটি অনন্য উদ্যোগ। এখানে স্থান পেয়েছে এমন সব নাটক, যা নিজেদের শিল্পমান ও বিষয়বস্তুর কারণে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় নতুন নাটক মঞ্চে আনার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তরুণ নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনয়শিল্পীদের সৃজনশীল প্রচেষ্টায় তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন প্রযোজনা। এসব প্রযোজনার মধ্য থেকে নির্বাচিত নাটকগুলোকে একই উৎসবের ছাতার নিচে নিয়ে আসা নাট্যদলগুলোর কাজকে বৃহত্তর দর্শক সমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর উদ্যোগ।
নাট্যবিশারদদের মতে, এমন উৎসব শুধু নাটক প্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি নাট্যকর্মীদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়, সৃজনশীল সংলাপ এবং নতুন দর্শক তৈরির ক্ষেত্রও তৈরি করে। একই সঙ্গে দেশের নাট্য আন্দোলনের সাম্প্রতিক প্রবণতা ও শিল্পমান মূল্যায়নের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়।
আট দিনের এই ‘নতুন নাটকের উৎসব’ তাই কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, বরং বাংলাদেশের সমকালীন নাট্যচর্চার এক উজ্জ্বল প্রদর্শনী। নতুন ভাবনা ও নতুন নির্মাণের এই মিলনমেলায় নাট্যপ্রেমীরা প্রত্যাশা করছেন প্রাণবন্ত কিছু সন্ধ্যা, যেখানে মঞ্চে উঠে আসবে সময়, সমাজ ও মানুষের নানা গল্প।