

মহাবিশ্ব কত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে সেই হারের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভুল পরিমাপ বের করেছেন ৪০ জন বিজ্ঞানীর একটি আন্তর্জাতিক গবেষকদল। সম্প্রতি তাদের প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, মহাবিশ্বের প্রসারণের হার প্রতি সেকেন্ডে প্রতি মেগা পার সেকেন্ড ৭৩.৫ কিলোমিটার। এই পরিমাপের অনিশ্চয়তার হার ±০.৮১, অর্থাৎ মাত্র এক শতাংশেরও কম।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) ফিজিক্যাল সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রনমি, স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রফিজিক্সের (কাসা) কোর গ্রুপের সদস্য ড. সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন এই গবেষণাপত্রটির অন্যতম রচয়িতা।
প্রায় ৪০ জন গবেষকের যে দলটিতে তিনি কাজ করেছেন তার নাম এইচ নট ডিসট্যান্স নেটওয়ার্ক (এইচওডিএন) কোলাবোরেশন। তাদের প্রকাশিত গবেষণাপত্রটির নাম ‘দা লোকাল ডিসট্যান্স নেটওয়ার্ক: এ কমিউনিটি কনসেনসাস রিপোর্ট অন দা মেজারমেন্ট অফ দা হাবল কন্সট্যান্ট অ্যাট ১% প্রিসিশন’ এটি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত ‘অ্যাস্ট্রনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রফিজিক্স’ সাময়িকীতে।
মহাবিশ্বের প্রসারণের হার–হাবল কন্সট্যান্ট (এইচ নট বা H₀)–নিয়ে বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা একমত হতে পারছেন না। এটি পরিমাপ করার অনেকগুলো পদ্ধতি প্রচলিত আছে যা ব্যবহার করে গত কয়েক দশকে বিজ্ঞানীদের বেশ কয়েকটি বড় বড় দল কাছাকাছি কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ডের (সিএমবি) তাপমাত্রার সূক্ষ্ম ওঠানামা বিশ্লেষণ করে মহাবিশ্বের শুরুর দিকের সম্প্রসারণের হার নির্ধারণ, সেফিড ভ্যারিয়েবল বা পরিবর্তনশীল নক্ষত্রের উজ্জ্বলতার ওঠানামা দেখে দূরত্ব নির্ধারণ; টাইপ ওয়ান-এ সুপারনোভার উজ্জ্বলতাকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার, ছায়াপথের ঘূর্ণন ও উজ্জ্বলতার সম্পর্ক (টালি–ফিশার) বিশ্লেষণ; ইত্যাদি।
পদ্ধতিগুলোর ক্যালিব্রেশন ও উপাত্তের পার্থক্যের কারণে ফলাফলেও কিছুটা অমিল দেখা যায়, বিশেষ করে সিএমবি পদ্ধতি এবং নিকটবর্তী ছায়াপথ পর্যবেক্ষণের উপর যে পদ্ধতিগুলো নির্ভর করে সেগুলোর মধ্যে। বিজ্ঞানীদের মাঝে এই মতভেদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘হাবল টেনশন’।
এতদিন অনেকে মনে করতেন বিভিন্ন পদ্ধতির গাণিতিক গণনায় তফাত বা সীমাবদ্ধতার কারণে এই অমিল তৈরি হচ্ছে। তবে, ড. আশরাফ উদ্দিন এবং তার সহযোগীদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিষয়টি এতটা সরল নাও হতে পারে।
ড. আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘পরিমাপের পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে এই অমিল দেখা যাচ্ছে কি না তা নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু আমরা দেখিয়েছি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে। ফলে এটিকে শুধু কোনো একটি পদ্ধতির ভুল বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।’
এই গবেষণায় একেকটি আলাদা পদ্ধতিকে আলাদাভাবে না দেখে একটি কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে। গবেষকরা একে বলছেন ‘ডিসট্যান্স নেটওয়ার্ক’। এতে বিভিন্ন পদ্ধতির তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে ফল যাচাই করা হয়েছে। ড. আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘আগে মনে করা হতো আলাদা আলাদা পদ্ধতির কারণে ফলাফলে পার্থক্য হচ্ছে। আমাদের গবেষণায় সবগুলো পদ্ধতিকে একসঙ্গে বিবেচনা করে দেখা গেছে, ফলাফল আসলে পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে করে একটি ধারণা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে যে, ‘হাবল টেনশন’ গণনা বা পদ্ধতিগত অমিল নয়, বরং পদার্থবিজ্ঞানের আরও গভীর কোনো বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করছে যা সম্পর্কে আমাদের এখনো জানা নেই।’
এইচওডিএন কোলাবোরেশনের সদস্যদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা অতীতে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে যেসব গবেষণা হয়েছে সেখানে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এতে করে কোনো একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখানোর সুযোগ এই গবেষণায় ছিলো না। তাদের মধ্যে ড. আশরাফ উদ্দিনও একজন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে উচ্চতর গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন।
ড. আশরাফ উদ্দিন আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে যারা এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করবেন, তাদের জন্য আমরা একটি নমনীয় ও স্বচ্ছ গবেষণা কাঠামো তৈরির চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে, আগামীতে আরো শক্তিশালী টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তকে আরো বেশি নিখুঁত ও সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে মহাবিশ্বের প্রসারণের হার পরিমাপের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
আইইউবির ফিজিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং কাসার পরিচালক ড. খান মোহাম্মদ বিন আসাদ বলেন, ‘কাসার মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের গবেষকদের আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছি। শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের আধুনিক গবেষণায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং বাংলাদেশেও মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চতর গবেষণার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।’
দেশের প্রথম ও একমাত্র জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতি পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে কাসা প্রতিষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালে। সম্প্রতি আইইউবির অ্যাকাডেমিক ভবনের ছাদে একটি ছোট আকারের ট্রান্সিয়েন্ট অ্যারে রেডিও টেলিস্কোপ (টার্ট) স্থাপন করেছে কাসা। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা উত্তর গোলার্ধেরই প্রথম টার্ট টেলিস্কোপ, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক মহাকাশ গবেষণার যাত্রা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতি পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা এবং এতে তরুণদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করছে কাসা।