

শরীরে আয়রনের ঘাটতি বা অ্যানিমিয়া কেবল ভেতর থেকে আমাদের দুর্বল করে দেয় না, বরং এর ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে আমাদের চেহারাতেও। অনেক সময় আয়নার সামনে দাঁড়ালে আমরা ত্বকের ফ্যাকাশে ভাব বা চোখের ক্লান্তি লক্ষ্য করি, যা হয়তো আমরা কেবল অনিদ্রা বা কাজের চাপ ভেবে এড়িয়ে যাই।
কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, আমাদের চোখ ও মুখের নির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন আসলে রক্তে আয়রনের অভাবের আগাম সতর্কবার্তা হতে পারে। হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেলে শরীরের কোষগুলো পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না, যার ফলশ্রুতিতে চেহারা তার স্বাভাবিক সজীবতা হারায়। আপনার অজান্তেই আয়রনের ঘাটতি শরীরে বাসা বাঁধছে কি না, তা বুঝতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখ ও মুখের এই ৫টি বিশেষ লক্ষণের দিকে নজর দিন।
১. চোখের নিচের পাতার ফ্যাকাশে ভাব
চোখের নিচের পাতার ভেতরের অংশ সাধারণত লালচে বা উজ্জ্বল গোলাপি রঙের হয়ে থাকে। এর কারণ হলো সেখানকার ক্ষুদ্র রক্তনালীতে হিমোগ্লোবিন সমৃদ্ধ রক্ত প্রবাহিত হয়। আয়রনের ঘাটতি হলে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যায়, ফলে চোখের ভেতরের এই অংশটি ফ্যাকাশে সাদা বা হালকা পীচ রঙের দেখায়। চিকিৎসকরা শারীরিক পরীক্ষার সময় একে ‘কনজাংটিভাল প্যালোর’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
২. চোখের নিচে কালো দাগ বা ডার্ক সার্কেল
ডার্ক সার্কেলের অনেক কারণ থাকতে পারে, যেমন: অনিদ্রা বা বংশগতি। তবে শরীরে আয়রনের অভাব হলে টিস্যুগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়, যা চোখের নিচের অংশকে তুলনামূলক কালচে করে তুলতে পারে। যদিও শুধু ডার্ক সার্কেল দেখে আয়রনের অভাব নিশ্চিত করা যায় না, তবে এটি একটি অন্যতম সংকেত হতে পারে।
৩. শুষ্ক বা চুলকানিযুক্ত চোখ
আমাদের চোখের অশ্রু গ্রন্থি বা ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড চোখকে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, আয়রনের ঘাটতি এই গ্রন্থির কাজকে ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে চোখে পর্যাপ্ত পানি বা অশ্রু তৈরি হয় না, যা চোখ শুষ্ক করে তোলে এবং চুলকানি বা জ্বালাপোড়ার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
৪. ত্বকের উজ্জ্বলতা হারানো ও ফ্যাকাশে ভাব
রক্তের হিমোগ্লোবিন ত্বককে একটি সজীব এবং সুস্থ আভা দেয়। কিন্তু আয়রনের অভাবে শরীর যখন পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না, তখন ত্বক ও ঠোঁট তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ঘাটতি তীব্র হলে ত্বক অনেকটা হলদেটে ভাবও ধারণ করতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্যালোর’ বলা হয়।
৫. ঠোঁটের কোণে ক্ষত বা ফাটল (অ্যাঙ্গুলার চেলাইটিস)
আপনার ঠোঁটের এক বা উভয় কোণে কি প্রায়ই ফাটল বা ব্যথাজনক ক্ষত দেখা দেয়? একে বলা হয় ‘অ্যাঙ্গুলার চেলাইটিস’। আয়রন কোষ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীরে আয়রন কমে গেলে ঠোঁটের চারপাশের টিস্যু পাতলা ও শুষ্ক হয়ে যায় এবং সহজে ফেটে যায়, যা পরে ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাল সংক্রমণের শিকার হতে পারে।
সতর্কতা ও করণীয়
যদি আপনি এসব লক্ষণের পাশাপাশি সারাক্ষণ ক্লান্তি অনুভব করেন, শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরার মতো সমস্যায় ভোগেন, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসক প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করবেন আপনার আয়রন সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন কি না। মনে রাখবেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া উচিত নয়, কারণ অতিরিক্ত আয়রন শরীরের জন্য বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে। তবে প্রাকৃতিক উপায়ে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার বা আয়রন-ফর্টিফাইড খাবার গ্রহণ করে সাধারণ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী বা যাদের ঋতুস্রাবের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হয়, তাদের আয়রনের মাত্রার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ