কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৪৭ পিএম
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৪৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
নতুন লিজ নীতিমালায়

বিমানবন্দরের ঝুঁকি দেখছেন অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় স্বপ্রণোদিত হয়ে তৈরি করা বিমানবন্দর লিজ নীতিমালা নিজেরাই অনুমোদনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে বিমানবন্দরে বড় ধরনের ঝুঁকি হতে পারে বলে মনে করছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

বেবিচকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ নীতিমালা সংস্কার নয়, মূলত প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা। এ ছাড়া এ ধরনের নীতিমালায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিমান বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরাও।

তাদের অভিযোগ, মাত্র দুই দিনের মধ্যে স্টেকহোল্ডারদের মতামত ছাড়াই খসড়া তৈরি করার প্রচেষ্টায় স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং সম্ভাব্য গোপন বাণিজ্যিক স্বার্থের বিষয়টি সামনে চলে আসছে। এভাবে নীতি তৈরির উদ্যোগ সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের (সিএএবি) আইনগত এখতিয়ারকে দুর্বল করে দেশের বিমান নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানকেই ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

সিএএবি সূত্র থেকে জানা যায়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৭ অনুযায়ী বিমানবন্দরের সম্পত্তি অধিগ্রহণ, ব্যবস্থাপনা ও লিজ দেওয়ার ক্ষমতা স্পষ্টভাবে সিএএবির ওপর ন্যস্ত। ১৯৯৬ সালের রুলস অব বিজনেসেও মন্ত্রণালয় কেবল নীতিগত দিকনির্দেশনার ক্ষমতা রাখে; সরাসরি বিমানবন্দর পরিচালনা বা সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় নয়। ফলে নতুন লিজ নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ আইনগত কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য।

এ ছাড়া তারা মনে করছেন, এটি কোনো নীতি সংস্কারের উদ্যোগ নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ তথা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা। সিএএবির সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। এতে বিমানবন্দর পরিচালনায় বাণিজ্যিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়তে পারে এবং সামগ্রিক নিরাপত্তায় বড় দুর্বলতা দেখা দিতে পারে, যার দায়ভার কে নেবে, তা স্পষ্ট নয়।

সিএএবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, এ নীতি তৈরির পুরো প্রক্রিয়াই হচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে যার ফলে স্টেকহোল্ডারদের মত নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নাম না প্রকাশের শর্তে সিএএবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন তাড়াহুড়ার প্রয়োজন কী? কেন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হলো না? এটি গোপনে পাস করিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।’ তার মতে, এর ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জানা যায়, প্রস্তাবিত নীতিতে যদি সর্বোচ্চ দরদাতার ভিত্তিতে লিজ দেওয়া হয়, তাহলে বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকা নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা বিধি এবং আইকাওর অ্যানেক্স-৯, ১৪, ১৭ ও ১৯-এ থাকা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি হবে। একজন সাবেক বিমান নিরাপত্তা পরিচালক বলেন, বাণিজ্যিক লিজিং যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়, তবে সংরক্ষিত এলাকায় অননুমোদিত প্রবেশ, চোরাচালান ও নিরাপত্তা ভঙ্গের ঘটনা বাড়তে পারে। সিএএবি যদি অপারেশনাল ক্ষমতা হারায় তাহলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে, কারণ বিমানবন্দর নিজেই আন্তর্জাতিক অডিটের অংশ।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দোকান, লাউঞ্জ, ডিউটি-ফ্রি শপ ও অন্য সেবায় যুক্ত উদ্যোক্তারা বলেন, বছরের পর বছর তারা ব্যক্তিগত অর্থ ও ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন। বড় দরদাতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে তাদের আশঙ্কা। এ ক্ষেত্রে পুরো লিজ-সংক্রান্ত বিষয়টিই একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একজন অপারেটর বলেন, একটি সিদ্ধান্তেই দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা পুরো ব্যবসায়িক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। এতে যাত্রীসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

সব মিলিয়ে বিমান বিশেষজ্ঞ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সিএএবির কর্মকর্তাদের অভিন্ন মত, স্টেকহোল্ডারদের মতামত ছাড়াই লিজ নীতি অনুমোদন করা হলে দেশের বিমান নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা সবই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। তারা এ নীতি চূড়ান্ত করার আগে স্বচ্ছতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং স্টেকহোল্ডারদের মতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সূত্র জানিয়েছে, গত ২৭ অক্টোবর বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি দিয়ে বেশ কিছু সুপারিশ দেন। সুপারিশে বলা হয়েছে বর্তমান আইন অনুযায়ী বিমান চলাচলের নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা ও প্রযুক্তিগত নিয়ম আন্তর্জাতিক মানে রক্ষা করা সম্ভব। সুতরাং, নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়নের আগে বিষয়টির বিস্তারিত পর্যালোচনার প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের আটটি বিমানবন্দরে প্রায় ২৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যেখানে শত কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

সুপারিশে বলা হয়, জনগণের স্বার্থে বর্তমান বেসামরিক বিমান চলাচল আইন, ২০১৭-এর ১৪ ধারাটি অপরিবর্তিত রাখা উচিত। কারণ, এই ধারায় চেয়ারম্যান দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রস্তাবিত সংশোধন কার্যকর হলে বেবিচকের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাবে, যা বিমান নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নিয়মাবলি প্রণয়নে বিলম্ব সৃষ্টি করবে এবং আইকাওর নিরীক্ষায় দেশের কার্যকারিতা দুর্বল হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আরব আমিরাতে ৪৪০ বাংলাদেশি বন্দিকে রাজকীয় ক্ষমা

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য দায়িত্বে থাকবে : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

আইনি বিপাকে শহিদের ‘ও রোমিও’

মাগুরা থেকেই নির্বাচন করতে চান সাকিব!

মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে গবেষণাভিত্তিক সমাধানে জোর দিতে চসিক মেয়রের আহ্বান

ভারত থেকে এলো ৫ হাজার টন চাল

বৈচিত্র্যময় খাবারে ‘টেস্টি ট্রিট’ ও ‘মিঠাই’র স্টলে দর্শনার্থীদের আগ্রহ

বিএনপিতে যোগ দিলেন এনসিপির শতাধিক নেতাকর্মী

৫০০ গজ ধাওয়া করে মিয়ানমারের নাগরিককে ধরল বিজিবি

ভারতকে রুখে দিয়ে বাংলাদেশের চমক

১০

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আরও ৩ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা

১১

কেএফসির মেন্যুতে নতুন চমক ‘বক্স মাস্টার’

১২

রাজশাহী বিভাগের ৩৯ আসনেই বিএনপি জিতবে : মিনু

১৩

আবারও আসছে শৈত্যপ্রবাহ, থাকবে যত দিন

১৪

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থগিত

১৫

১১ দলের স্থগিত সংবাদ সম্মেলন নিয়ে যা বলছে ইসলামী আন্দোলন

১৬

লিবিয়ায় বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল হাবীব উল্লাহ

১৭

চবিতে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে দুদকের অভিযান

১৮

বিএনপি নেতা ডাবলুর জানাজা সম্পন্ন

১৯

নরসিংদীতে অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেপ্তার ৭

২০
X