নির্বাচনসহ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বন্ধু দেশের হস্তক্ষেপ বাংলাদেশ চায় না বলে সাফ জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম। তিনি বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের স্বাগত জানানো হবে। আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোনো চাপ অনুভব করছে না সরকার।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রোববার (২৫ জুন) কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিকাবের অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘ডিকাব টক’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ডিকাব সভাপতি রেজাউল করিম লোটাস ও সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রকেই আমরা বলিনি বা বলব না বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আলোচনা করতে। নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে মন্তব্য বা নাক গলানো আমরা স্বাগত জানাব না। অতীতেও আমাদের অবস্থান বলেছি। তারপরও যারা এটা করেন, আমরা কখনই এটাকে স্বাগত জানাব না। কিন্তু একটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নির্বাচন নিশ্চিত করার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বদ্ধ পরিকর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, তার সরকার এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন কোনো মডেল নির্বাচন ছিল না। ওই নির্বাচন নিয়ে আমাদেরও খেদ আছে। যারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারা রাখতে চায় না, তারা অসহযোগিতা করেছে। কেননা আমাদের দেশে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার নজির আছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও সেন্টমার্টিন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সময়ের বক্তব্য প্রসঙ্গে শাহরিয়ার বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিজ্ঞতার আলোকে কথা বলেছেন। তার ব্যাখ্যার পর এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এমনকি ন্যূনতম স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে এমন কিছু প্রধানমন্ত্রী করবেন না।
বাংলাদেশ নিয়ে অতীতে অবশ্যই ষড়যন্ত্র হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ভারতের প্রশ্ন এলে আওয়ামী লীগ সরকারকে, নেতৃত্বকে বা প্রধানমন্ত্রীকে আমরা সঠিকভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখছি না বা অনেক ছাড় দিচ্ছি এ ধরনের নানা দোষে সাব্যস্ত করা হয় বা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় বিষয় যেটা কাজ করেছে আমরা ভারতকে গ্যাস দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছি মার্কিন চাপের মুখে। কই তখন তো কেউ এনালাইসিস করে বলেন না শেখ হাসিনা কেন ভারতকে গ্যাস দিল না।
বঙ্গবন্ধুকন্যার ডিকশনারিতে ‘ভীতি’ শব্দটি নেই
আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার কোনো চাপে রয়েছে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বঙ্গবন্ধুকন্যার ডিকশনারিতে ভীতি শব্দটি নেই। বিগত সাড়ে ৯ বছরে অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করেছি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতায় আমরা এখন একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ পেয়েছি।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৪ সালে আমি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করি, তার তিন দিনের মধ্যে একটি ডিপ্লোমেটিক ব্রিফিংয়ের আয়োজন করি। ওই ব্রিফিংয়ে বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা নেতিবাচক কিছু বলেননি। তবে একজন বলেছিলেন, তারা বর্ষার আগে নতুন একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চান। আমি এই প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিলাম না বলে কোনো নোটও প্রস্তুত ছিল না। তবে জবাবে ওই চাওয়াকে আমি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বিষয় বলেছিলাম। তখনো কোনো চাপ মনে করিনি। এখনো অনুভব করি না।
‘আমরা সংবিধান অনুযায়ী, সরকারের ম্যান্ডেট যতদিন আছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে যাবে। যে সময়ে নির্বাচন কমিশন তাদের তপশিল ঘোষণা করবে, যেদিন থেকে বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশনের আওতাভুক্ত হয়ে যাবে, সেদিন সরকার নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—তার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এখানে থমকে যাওয়া, ফিরে দেখা বা সন্দেহের কারণ নেই।’
ব্রিকসে যোগদান ব্যাকআপ প্ল্যান নয়
এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমার জানামতে ব্রিকসে যোগদানের আবেদন ফরম নেই। ১৪ জুন জেনেভায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বর্তমান ব্রিকস চেয়ার দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের ব্রিকসে যোগ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। পরে আমরা একটি চিঠি দিয়েছি। এটাকে আপনারা আবেদন বললেও বলতে পারেন। ব্রিকসে যোগদান ব্যাকআপ প্ল্যানের কোনো অংশ নয়। এই জোটের মার্কিন ডলারকে বাইপাস করারও লক্ষ্য নয়।’
শান্তিরক্ষীদের বিরোধিতাকারীরা বাংলাদেশের শত্রু
ঢাকা সফররত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যঁ পিয়েরে লাক্রোয়ার সঙ্গে গতকাল শনিবার (২৪ জুন) দুপুরে বৈঠক করেন শাহরিয়ার। বৈঠকে বিভিন্ন মহল থেকে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের যাচাইবাছাই করে নেওয়ার দাবি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চান সাংবাদিকরা।
জবাবে শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আমাদের গর্বের সেনাবাহিনী, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত শান্তিরক্ষী বাহিনী গোটা পৃথিবীতে সুনামের সঙ্গে কাজ করে উদাহরণ হয়েছে। টানা প্রায় ১০ বছর ধরে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। এ পর্যন্ত প্রায় ১৬৯ জন জীবনও দিয়েছেন। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের জীবনবাজি রেখে অর্জনকে যারা খাটো করে দেখছেন বা এ অর্জনকে ব্যর্থ করে দেওয়ার অপচেষ্টা করছেন; তারা বাংলাদেশের বন্ধু নন, তারা আমাদের শত্রু। তাদের যারা প্রমোট করেছেন পয়সা দিয়ে, বাংলাদেশের মানুষের সময় এসেছে তাদের চিনে নেওয়ার।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যাদের ওপর দায়িত্ব পৃথিবীর মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার, তারা কোনো এক অদ্ভুত কারণে ধারাবাহিকভাবে সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় থেকে শুরু করে অদ্যাবধি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এটা দুঃখজনক।
লবিংয়ের জন্য ইউরোপ-আমেরিকায় চিঠি নিয়ে ঘুরছে বিএনপি
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, তার কাছে দুটো চিঠির ড্রাফট আছে। বিএনপির লোকজন টাকা, চিঠির ড্রাফট হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন রাজনীতিবিদের কাছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে নিশ্চিত থাকবেন এ ধরনের চিঠির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
ইউরোপীয় ছয় সংসদ সদস্যের চিঠির বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ইউরোপের পার্লামেন্টের সদস্য যারা কোনো দিন বাংলাদেশে আসেননি, আমার সত্যিই সন্দেহ হয় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় সেটাও তারা জানেন কি না। অথচ তারা স্টেটমেন্ট দিয়ে দিচ্ছেন।’
বিদেশে সরকারের লবিস্ট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শাহরিয়ার বলেন, ‘আমাদের একটি পিআর ফার্ম আছে। নেলসন মুলিনস। যাদের মাসিক ফি ২০ বা ২৫ হাজার ডলার। আমরা বিজিআর নামে আরেকজনকে এনগেজ করেছিলাম লেখালেখির জন্য, নিউজ পেপার আর্টিকেলের জন্য। তাদের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট রিনিউ করিনি।’
মন্তব্য করুন