সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১২ এএম
অনলাইন সংস্করণ

রমজানে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে নতুন সরকারের নিকট প্রত্যাশা  

নিত্যপণ্যের বাজার। ছবি : সংগৃহীত
নিত্যপণ্যের বাজার। ছবি : সংগৃহীত

পবিত্র রমজান মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মসংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক দায়িত্বও বিশেষ গুরুত্ব পায়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, বিশেষত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারগুলোর জন্য। তাই আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা-স্বস্তির বাজার ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।

রমজান মাসে খাদ্যপণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বৃদ্ধি পায়। ছোলা, ডাল, চিনি, তেল, খেজুর, বেগুনসহ ইফতারসামগ্রীর বিক্রি বাড়ে। এই বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির পথ বেছে নেয়-এমন অভিযোগ বহু বছরের। ফলে বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়, যা ধর্মীয় আবহকে ব্যাহত করে এবং মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে এ ধরনের অনিয়ম চলতে পারে না।

নতুন সরকারের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা। নির্বাচনী অঙ্গীকারে জনকল্যাণ, সুশাসন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। রমজান সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর তদারকি, নিয়মিত মনিটরিং এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ- এসব পদক্ষেপ দৃশ্যমান হতে হবে। কেবল অভিযান চালানো নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বাজারনীতি গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথমত, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল ও স্বচ্ছ রাখা প্রয়োজন। পণ্য আমদানি, উৎপাদন ও পরিবহনে যেন কোনো কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বন্দর, গুদাম ও পাইকারি বাজারে নজরদারি জোরদার করা উচিত। কোথাও যেন অযথা পণ্য আটকে না থাকে বা মজুতদারি করে বাজারে সংকট তৈরি করা না যায়—সে ব্যাপারে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও সুশৃঙ্খল করা দরকার, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীরা সঠিকভাবে পণ্য পান। ডিজিটাল কার্ড বা তালিকাভুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়ানো গেলে অপচয় ও অনিয়ম কমবে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও এ ধরনের কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

তৃতীয়ত, বাজারে প্রতিযোগিতা ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিদিনের পণ্যমূল্যের তালিকা প্রকাশ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে হালনাগাদ তথ্য প্রদান এবং ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরতে পারে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করে তুলতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই প্রতিকার পায়।

চতুর্থত, ব্যবসায়ী সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। রমজান কেবল লাভের মাস নয়; এটি আত্মসংযম ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ব্যবসায়ীদের উচিত অযৌক্তিক মুনাফা পরিহার করা। সরকার চাইলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে মূল্য নির্ধারণে একটি সহনীয় কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ সুবিধা উন্নয়ন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোও জরুরি। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে যত বেশি স্তর যুক্ত থাকে, তত বেশি মূল্য বৃদ্ধি পায়। সরাসরি কৃষক বাজার বা ডিজিটাল বিপণনব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন এবং ভোক্তাও স্বস্তি পাবেন।

রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। একজন রোজাদার যখন ইফতারের সামান্য উপকরণ কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত মূল্য দিতে বাধ্য হন, তখন তার কষ্ট দ্বিগুণ হয়। এই কষ্ট লাঘব করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নতুন সরকারের উচিত স্পষ্ট বার্তা দেওয়া—অসাধু কারসাজি বরদাস্ত করা হবে না, এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ কঠোরতা অবলম্বন করবে।

সবশেষে বলা যায়, রমজানে স্বস্তির বাজার নিশ্চিত করা কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; এটি সরকারের প্রতি জন-আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। জনগণ দেখতে চায় কথার চেয়ে কাজে প্রতিফলন। যদি বাজার স্থিতিশীল থাকে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সুলভে পাওয়া যায় এবং সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে রোজা পালন করতে পারে, তবে সেটিই হবে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সাফল্য। পবিত্র এই মাসে সহমর্মিতা, ন্যায় ও দায়িত্বশীলতার চর্চাই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খাল নিয়ে আ.লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষ

আর্জেন্টিনা সমর্থকদের জন্য ফ্রি চিকিৎসা ও বিশেষ ছাড় ঘোষণা চিকিৎসকের

ইসরায়েলি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে আল-আকসায় জুমার নামাজে মুসল্লিদের ঢল

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জাতীয় দলে ফিরছেন সালাউদ্দিন

ঈশ্বরদীর লিচুর জন্য হিমাগার স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে : বাণিজ্যমন্ত্রী

কেন্দ্রীয় যুবদলকে স্বাগত জানিয়ে সাতক্ষীরায় জেলা যুবদলের র‍্যালি

চলতি মাসেই ভারতীয় হাইকমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন দীনেশ ত্রিবেদী

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ / সবুজ পরিবেশ, নিরাপদ কৃষি ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশই আমাদের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি, ৫ দিনের রিমান্ডে দুই আসামি

বাংলাদেশে ১৫ বছর পর ওয়ানডে খেলতে এলো অস্ট্রেলিয়া

১০

সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল ও নজরদারি জোরদার

১১

ব্রাজিলের বিখ্যাত ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতে এবার বিশ্বকাপ জিতবে পর্তুগাল

১২

দৌলতদিয়ার বাস ডুবির ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন : নৌ প্রতিমন্ত্রী

১৩

আর্জেন্টিনার সামনে সেই পুরোনো অভিশাপ

১৪

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের পাশে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় : উপাচার্য 

১৫

বিশ্বকাপে ভুভুজেলা নিষিদ্ধ করল ফিফা, কঠোর হচ্ছে স্টেডিয়াম প্রবেশনীতি

১৬

ভেঙে গেল জার্মানীর বিশ্বকাপজয়ী তারকার দুই দশকের সংসার

১৭

আম খাওয়ার পর ভুলেও খাবেন না এই ৫ খাবার

১৮

অবশেষে ‘অলৌকিক’ সেই গাছ নিয়ে রহস্যের অবসান

১৯

অস্ত্র নামাবে না হামাস, সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের সিদ্ধান্তও আলোচনা ছাড়া নয়

২০
X