

বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই শুনি, জনগণই ক্ষমতার মালিক। সংবিধানও তাই বলে। কিন্তু বাস্তবে যদি ভোটের প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়, ফলাফল কারচুপির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, অথবা কোনো বৃহত্তর শক্তির অদৃশ্য নির্দেশনায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাঁক নেয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে, মালিক আসলে কে?
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। কিন্তু যদি অভিযোগ ওঠে প্রশাসন নিরপেক্ষ ছিল না, গণমাধ্যম বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে, অথবা অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শক্তির প্রভাব বিস্তার ঘটেছে, তাহলে সেই নির্বাচনের নৈতিক ভিত্তি কোথায় দাঁড়ায়?
প্রথম প্রশ্ন, গণমাধ্যমের বিভ্রান্তি কীভাবে দূর হবে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তথ্যের স্বচ্ছতা অপরিহার্য। তথ্য যদি আংশিক, বিকৃত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পরিবেশিত হয়, তবে জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ হারায়। প্রয়োজন স্বাধীন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্য উন্মুক্তকরণ আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব তথ্যের বাধ্যতামূলক প্রকাশ। গণমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক বা কর্পোরেট প্রভাব থাকলে তা শনাক্ত ও প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, কে বা কারা জড়িত ছিল? কোনো অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া সত্য বলা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি তদন্ত ছাড়া অস্বীকার করাও সমান ক্ষতিকর। একটি স্বাধীন বিচারিক কমিশন, আন্তর্জাতিক মানের অডিট এবং প্রযুক্তিগত ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত কারচুপির অভিযোগ যাচাই করতে হবে। দায় নির্ধারণ ছাড়া আস্থার সংকট কাটে না।
তৃতীয় প্রশ্ন, প্রশাসন দুর্নীতি করেনি তা কীভাবে নিশ্চিত হলো? মৌখিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, প্রকাশ্য প্রতিবেদন এবং নাগরিক পর্যবেক্ষণের সুযোগ। প্রশাসনের কার্যক্রম জনসমক্ষে পর্যালোচনার আওতায় না এলে নিরপেক্ষতার দাবি বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।
চতুর্থ প্রশ্ন, প্রভাব বিস্তার হয়নি তার প্রমাণ কী? রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, নিরাপত্তা কাঠামো, অর্থনৈতিক প্রণোদনা কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে যদি ভোটার আচরণ বা প্রার্থী নির্বাচনে প্রভাব পড়ে, তবে সেটি সরাসরি গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ। প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক অর্থায়নের পূর্ণ স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক বদলি ও নিয়োগে নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। যদি সত্যিই কোনো আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক শক্তি, অথবা অভ্যন্তরীণ কোনো অদৃশ্য শক্তিকেন্দ্র নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে, তাহলে জনগণের ভোটাধিকার কি বাস্তবে অক্ষুণ্ণ থাকে? যদি জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত না হয়, তাহলে এত সংগ্রাম, ত্যাগ ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রয়োজন কী ছিল?
গণতন্ত্রে নির্বাচন কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি একটি সামাজিক চুক্তি। জনগণ ভোট দেয় এই বিশ্বাসে যে তাদের মতামত গণনায় প্রতিফলিত হবে। সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণেই ব্যঙ্গের জন্ম হয়।
স্বাভাবিক নাগরিকরা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিলেন। রোদে পুড়লেন, বৃষ্টিতে ভিজলেন, ব্যালটে সিল মারলেন নিজের পছন্দের প্রতীকে। তাঁরা ভেবেছিলেন, এটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে সাধারণ ও সুন্দর চিত্র।
কিন্তু আমাদের দেশে নাকি কিছু ‘অসাধারণ’ মানুষও আছেন। তারা এতটাই দক্ষ যে সাধারণ মানুষের সরল ভোট তাদের কাছে কাঁচামাল মাত্র। ভোট পড়েছে এক জায়গায়, তারা সেটাকে সামান্য ‘সংস্কার’ করে দিলেন। সিল যদি একটু এদিক ওদিক হয়, সংখ্যা যদি একটু কমবেশি হয়, ব্যালট যদি একটু ‘সংশোধন’ চায়, তারা প্রস্তুত। এই কারিগরি দক্ষতার নামই ইঞ্জিনিয়ারিং।
জনগণ ভোট দেয়, বিশেষজ্ঞরা ফলাফল গুছিয়ে দেন। জনগণ ভাবে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেন সিদ্ধান্তটি ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ’ হয়েছে কি না। এখানে ভুল হয় না, কেবল সমন্বয় হয়। কারচুপি হয় না, কেবল কারিগরি সমাধান হয়। জনরায় বদলায় না, কেবল ব্যাখ্যা পাল্টায়।
প্রশ্ন তখন একটাই, যদি জনগণের ভোটকে পরে “সংস্কার” করতেই হয়, তাহলে ব্যালট বাক্সের এত আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন কী?
তাহলে প্রতিরোধ কীভাবে সম্ভব? প্রথমত, প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা। ভোট গণনার প্রতিটি ধাপ স্বাধীন অডিট ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, গণমাধ্যম সংস্কার। মালিকানা ও অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে সংবাদমাধ্যম সম্পূর্ণ স্বাধীন হতে পারে না। চতুর্থত, নাগরিক অংশগ্রহণ। ভোট পর্যবেক্ষণ, তথ্য যাচাই এবং জনমত গঠনে নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করতে হবে। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বচ্ছতা। কোনো বিদেশি প্রভাব রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখলে তা সংসদীয় নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
সবশেষে মূল প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে। আমরা কি সত্যিই জনগণকে মালিক হিসেবে দেখতে চাই, নাকি কেবল একটি শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার করতে চাই?
গণতন্ত্র নিষ্ঠুর হতে পারে, কারণ এখানে সংখ্যাই শেষ কথা। কিন্তু গণতন্ত্র অন্ধ নয়। অন্ধ করে দেওয়া হয় তখনই, যখন তথ্য গোপন থাকে, তদন্ত হয় না, জবাবদিহি অনুপস্থিত থাকে।
সবশেষে আরও একটি কথা। প্রশ্ন কে করবে? যদি আমরা প্রত্যেকে হৃদয়ে ধারণ না করি যে বাংলাদেশ আমাদের সবার, তাহলে প্রশ্ন তোলার নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়। রাষ্ট্র কোনো দলের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়, কোনো গোষ্ঠীর আধিপত্যের ক্ষেত্র নয়, কোনো বহিরাগত প্রভাবের পরীক্ষাগারও নয়। রাষ্ট্র মানে নাগরিকের সম্মিলিত ইচ্ছা, অধিকার ও দায়িত্ব। প্রশ্ন তোলা বিদ্বেষ নয়, প্রশ্ন তোলা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা।
আমরা প্রায়ই একটি শব্দ ব্যবহার করি, রাজাকার। ইতিহাসে এর অর্থ স্পষ্ট ছিল। কিন্তু আজ কি এটি কেবল অতীতের পরিচয়, নাকি একটি মানসিকতার প্রতীক? যদি কেউ দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে দুর্বল করে, যদি জনগণের ভোটাধিকারকে খর্ব করে, যদি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া বা অদৃশ্য প্রভাবের ওপর নির্ভর করে, তবে সেই প্রবণতাকে আমরা কী নামে ডাকব? আবার সব দেখেও যদি কেউ নীরব থাকে, ব্যক্তিগত সুবিধার কারণে সত্য উচ্চারণ থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে সেটি কি নৈতিক দায়মুক্তি?
রাজাকার কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। যে কোনো সময়ে, যে কোনো ব্যবস্থায়, যখন জনগণকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যখন সত্যকে আড়াল করা হয় স্থিতিশীলতার অজুহাতে, যখন প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত করা হয় ঐক্যের নামে, তখন সেই মানসিকতার পুনর্জন্ম ঘটে।
আমরা কবে নাগাদ এই মানসিকতা থেকে মুক্ত হবো? যখন ব্যক্তি, দল ও প্রতিষ্ঠান সবার আগে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিকের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেবে। যখন প্রশাসন প্রমাণ ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করবে। যখন গণমাধ্যম ভয় বা পক্ষপাত ছাড়া সত্য অনুসন্ধান করবে। যখন নাগরিক নীরব দর্শক না থেকে সচেতন অংশগ্রহণকারী হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছে। কারণ রাষ্ট্রকে দুর্বল করা যেমন অপরাধ, তেমনি অন্যায় দেখেও সুবিধাবাদী নীরবতায় থাকা একটি গভীর নৈতিক ব্যর্থতা। একটি জাতি তখনই পরিণত হয়, যখন সে আত্মসমালোচনার সাহস রাখে এবং সত্যের মুখোমুখি হতে দ্বিধা করে না। বাংলাদেশ আমাদের সবার। যদি আমরা সত্যিই তা বিশ্বাস করি, তবে প্রশ্ন তোলা আমাদের দায়িত্ব, প্রমাণ দাবি করা আমাদের অধিকার, আর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন