কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০১:২৮ এএম
আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি ছাড়া থামবে না নিপীড়ন

মোনছেফা তৃপ্তি। ছবি : সংগৃহীত
মোনছেফা তৃপ্তি। ছবি : সংগৃহীত

মোনছেফা তৃপ্তি

আজ ৪ মার্চ- বিশ্ব যৌন নিপীড়নবিরোধী দিবস। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় যৌন নিপীড়নের খবর দেখতে দেখতে আমরা যেন অনেকটাই গা-সওয়া হয়ে গেছি। হঠাৎ করে একদিন ক্যালেন্ডারের পাতায় খুঁজে পাই-বিশ্বজুড়ে এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় যে যৌন সহিংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি সামাজিক কাঠামো, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি জটিল সমস্যা।

আজ যখন লিখতে বসেছি, ততক্ষণে যৌন সহিংসতার শিকার ছোট্ট ইরা মণি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। ইরাকে শুধু ধর্ষণ করা হয়নি; ধর্ষণের পর তার শ্বাসনালী কেটে দেওয়া হয়েছিল। কী বীভৎস! কী নির্মম! অথচ এরকম কত ঘটনাই বা আমরা জানতে পারি? হয়তো আরও অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যেগুলো কখনোই সামনে আসে না।

ক্রিমিনোলজির দৃষ্টিতে যৌন নিপীড়নকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা হলো ‘পাওয়ার অ্যান্ড কন্ট্রোল’ বা ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের মনোবৃত্তি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা কেবল যৌন আকাঙ্ক্ষার ফল নয়; বরং এটি অন্যের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি উপায়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা অনেক সময় পুরুষকে এমন এক ক্ষমতার অবস্থানে দাঁড় করায়, যেখানে নারীর শরীর ও স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা তৈরি হয়। ফলে অপরাধী মনে করে সে শাস্তি এড়াতে পারবে কিংবা তার আচরণকে সমাজ সহনীয় বলে মনে করতে পারে।

ক্রিমিনোলজির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হলো ‘রুটিন অ্যাক্টিভিটি থিওরি’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার জন্য তিনটি বিষয় একসঙ্গে উপস্থিত থাকতে হয়- সম্ভাব্য অপরাধী, সম্ভাব্য ভুক্তভোগী এবং কার্যকর প্রতিরোধের অভাব। আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা গণপরিবহনে পর্যাপ্ত নজরদারি ও জবাবদিহিতা নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী যদি দুর্বল অবস্থানে থাকেন, তবে দোষ চাপানো হয় তার ওপরই। এই পরিস্থিতি অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে।

সাইকোলজির দৃষ্টিতে যৌন নিপীড়নের পেছনে কাজ করে ডিহিউম্যানাইজেশন। অর্থাৎ অন্য মানুষকে সমান মর্যাদার ব্যক্তি হিসেবে না দেখে কেবল একটি বস্তু হিসেবে দেখা। যখন একজন ব্যক্তি অন্যকে ‘অধিকারযোগ্য শরীর’ হিসেবে ভাবতে শুরু করে, তখন সহিংস আচরণ সহজ হয়ে যায়। একই সঙ্গে গ্রুপ নরমালাইজেশন বা সামাজিক স্বাভাবিকীকরণও বড় ভূমিকা রাখে। অনেক সময় বন্ধুদের আড্ডা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে নারীবিদ্বেষী মন্তব্যকে হাস্যরস হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ধীরে ধীরে এই আচরণগুলোই সহিংসতার সংস্কৃতিকে বৈধতা দেয়।

ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। দেখা যায়, অনেক কম বয়সী ছেলেও অত্যন্ত অশ্লীল ও নারীবিদ্বেষী ভাষা ব্যবহার করছে। অথচ তাদের বয়স এমন যে বাস্তব জীবনে নারী সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নেওয়ার মতো সামাজিক পরিসরই এখনও তৈরি হয়নি—নিজের মা বা বোনের বাইরেও হয়তো তাদের কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। তবুও তারা অনলাইনে নারীদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করছে। সাইকোলজির ভাষায় এটি সামাজিক শেখা (Social Learning)-র একটি উদাহরণ। শিশুরা ও কিশোররা তাদের চারপাশের পরিবেশ—বন্ধুদের আচরণ, অনলাইন কনটেন্ট কিংবা বড়দের ভাষা—অনুকরণ করে। যদি সেই পরিবেশে নারীর প্রতি অসম্মানকে স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়, তবে কিশোরদের মধ্যেও সেই মানসিকতা দ্রুত গড়ে ওঠে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ধারণা হলো বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট—অর্থাৎ অন্যায় দেখেও অনেক মানুষ নীরব থাকে। কারণ তারা মনে করে অন্য কেউ হয়তো প্রতিবাদ করবে। কিন্তু বাস্তবে সেই ‘কেউ’ প্রায়ই সামনে আসে না। ফলে অপরাধী আরও সাহস পায় এবং ভুক্তভোগী একা হয়ে পড়ে। এই নীরবতাই নিপীড়নের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে।

তাহলে প্রশ্ন- এই পরিস্থিতি বদলাবে কিভাবে? শুধু আইন প্রণয়ন করলেই তো হবে না; আইনের সঠিক ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।

প্রথমত, পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় লিঙ্গসমতা ও সম্মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে সম্মতি (consent), ব্যক্তিগত সীমা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার গুরুত্ব।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে দ্রুত ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা। ক্রিমিনোলজির গবেষণা বলছে, অপরাধ কমাতে সবচেয়ে কার্যকর উপাদান হলো শাস্তির কঠোরতা নয়, বরং শাস্তির নিশ্চিততা। অপরাধী যদি নিশ্চিতভাবে জানে যে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে, তবে অপরাধের প্রবণতা অনেকটাই কমে।

তৃতীয়ত, সমাজে গড়ে তুলতে হবে বাইস্ট্যান্ডার ইন্টারভেনশন সংস্কৃতি—অর্থাৎ অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করার সামাজিক সাহস। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধকে কেবল নারীর নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে না দেখে একটি সুস্থ সমাজ গঠনের প্রশ্ন হিসেবে দেখা। এই বিষয়টি কেবল নারীর একার উদ্বেগ নয়; এটি নারী, পুরুষ এবং রাষ্ট্র- সবারই উদ্বেগ ও দায়িত্বের বিষয়। প্রয়োজন নারী ও পুরুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে অধিকার ও দায়িত্বের ন্যায্য প্রতিষ্ঠা করা। প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে থাকতে পারে।

এটিও মনে রাখা জরুরি যে যৌন নিপীড়নের প্রশ্নে অপরাধী সব সময় পুরুষই হবে—এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে নারীরাও নিপীড়নের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। আবার পুরুষরাও যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে। তাই এই সমস্যাকে একপাক্ষিকভাবে না দেখে একটি সামগ্রিক সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

যৌন নিপীড়ন বন্ধ করতে রাষ্ট্রকেই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। আইনের কঠোর ও কার্যকর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। তবে এটি শুধু আইন বা প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি একই সঙ্গে একটি সামাজিক ও মানসিক রূপান্তরের বিষয়।

নীরবতা নয়, প্রতিবাদ; অবহেলা নয়, অন্তর্ভুক্তি—এই সংস্কৃতি যদি সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবেই যৌন নিপীড়নের অন্ধকার ভাঙা সম্ভব। চলুন সকলে মিলে একসাথে নারীর প্রতি সকল ধরনের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি অঙ্গীকারবদ্ধ সমাজ গড়ে তুলি।

লেখিকা : পরিবেশ ও নারী অধিকারকর্মী

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শূন্য রেখায় থাকা সেই ১৭ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ

প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা: নবম পে-স্কেল নিয়ে বড় দুঃসংবাদ

দেশে স্বর্ণের দামে বড় পতন, ভরি কত

ইরানের রাডার স্থাপনায় মার্কিন হামলা

সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ

মধ্যরাতে শাকিব-বুবলীকে নিয়ে মিষ্টি জান্নাতের রহস্যময় পোস্ট

পরিস্থিতি সামলাতে আমি খুব দ্রুত এগোচ্ছি : ট্রাম্প

স্বামীর সঙ্গে অভিমানের জেরে অন্তঃসত্ত্বা কলেজছাত্রীর আত্মহত্যা

সরকারি কর্মচারীর অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি, উৎস নিয়ে প্রশ্ন

টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউজবোটের ইঞ্জিনে পড়ে শিশুর মৃত্যু, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

১০

দেশে ফিরেছেন ৩২ হাজার ৮৩২ হাজি, ৪৮ জনের মৃত্যু

১১

এক বাবার কষ্ট, হাজার মানুষের জীবনরক্ষার প্রেরণা  

১২

৬ জুন / কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

১৩

শেষ হচ্ছে দীর্ঘ ছুটি, কবে খুলছে স্কুল-কলেজ

১৪

চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডারের আসামি গ্রেপ্তার

১৫

ছোট বোনকে বাঁচাতে গিয়ে তলিয়ে গেল বড় বোন

১৬

রাত থেকে সড়কে কড়াকড়ি, অস্ত্র বহন ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ

১৭

এক একটি ফুল যেন একেকটি রঙের গল্প

১৮

ইরানের এলপিজি রপ্তানি নেটওয়ার্কে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

১৯

বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় শোক প্রস্তাব

২০
X