বিদিশা এরশাদ
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

ভাঙতে ভাঙতে তবু ভালোবাসি

বিদিশা এরশাদ। ছবি : সংগৃহীত
বিদিশা এরশাদ। ছবি : সংগৃহীত

আমি মানুষকে ভালোবাসি। এই কথাটা আজও সত্য, আজও পরিষ্কার, আজও আমার বুকের ভেতর থেকে উঠে আসে কোনো দ্বিধা ছাড়াই। কিন্তু কীভাবে ভালোবাসি, সেটা বদলেছে। একটু একটু করে, বছরের পর বছর ধরে, কিছু মানুষের হাতে আঘাত খেতে খেতে আমি শিখেছি দূরত্ব রেখেও ভালোবাসা যায়। ভালোবাসা কমে না, শুধু একটু সাবধান হয়।

আমি জন্মগতভাবে সহজ মানুষ। এই সহজ হওয়াটা কোনো গুণ নয়, এটা আমার স্বভাব। কোথাও আগুন জ্বললে আমি ধোঁয়া দেখেই ছুটে যাই, আগুনটা কোথা থেকে লাগল সেই হিসাব কষার ফুরসত আমার থাকে না। আমি হিসাবের মানুষ নই, অনুভূতির মানুষ। যাকে দেখি তার চোখে কষ্ট দেখলে আমার বুকে চিন ধরে। রাস্তার ক্ষুধার্ত শিশু দেখলে আমি থমকে যাই, পথের কুকুর দেখলে আমার চোখ ভিজে আসে।

আশ্চর্যের কথা হলো, এই অনুভূতিটা যেন ওরাও টের পায়। আমার পাড়ার কুকুরগুলো আমাকে দেখলেই ছুটে আসে, গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়ায়। যেন ওরা বোঝে, এই মানুষটা ওদের ব্যথা বুঝতে পারে। এই অনুভূতির শেকড়টা কোথায়, সেটা হয়তো আমার শৈশবেই লুকিয়ে আছে।

আমার ছোটবেলার প্রাথমিক শিক্ষার অনেকটাই হয়েছে লন্ডনে, ব্রিটিশদের সাথে। তারা সাদাকে সাদা বলে, কালোকে কালো। তাদের কথায় কোনো প্যাঁচ নেই, কথার আড়ালে কথা নেই। আমিও সেটাই শিখেছি। মনে যা আসে মুখে তাই বলি, যা বলি তাই করি। এই সরলতাটাই পরে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়েছে, আবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও।

আঠারো বছর বয়সে আমি জীবনের প্রথম চাকরিটা নিয়েছিলাম একটা ওল্ড এজ হোমে। বয়স্কদের আবাস সেটা, মৃত্যুপথযাত্রীদের শেষ ঠিকানা। আমার কাজ ছিল একটাই, যারা শেষ সময়ে এসে পৌঁছেছেন তাদের মনের ইচ্ছার খাবারটা বাড়ি থেকে রান্না করে এনে খাওয়ানো। আমি সেই কাজটা পরম আনন্দে করতাম। প্রতিটা রান্নায় ঢেলে দিতাম সমস্ত ভালোবাসা। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে দেখতাম কেউ না কেউ চলে যাচ্ছেন। তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, বুঝতাম তারা কী বলতে চাইছেন। একটা সময় ভেতরটা ভেঙে পড়তে শুরু করল, ডিপ্রেশন ঢুকে গেল মনের গভীরে। শেষপর্যন্ত চাকরিটা ছাড়তে হলো।

কিন্তু অভ্যাসটা গেল না। আজও শুনলে যে কেউ জটিল রোগে শেষ সময়ের কাছাকাছি, আমি নিজে হাতে রান্না করে পৌঁছে যাই তার প্রিয় খাবার নিয়ে। এটা কি শুধু আমার দুর্বলতা? নাকি এটাই আমার পরিচয়? আমি মনে করি এটাই আমার পরিচয়।

মানুষের বিপদে বসে থাকার শক্তি আমার নেই। সাঁতার না জানলেও নদীতে লাফ দিই। ফেসবুকে কষ্টের একটা পোস্ট দেখলে রাতের ঘুম উড়ে যায়। আমি জানি এই স্বভাব বদলানো কঠিন, হয়তো বদলাবেও না। কিন্তু জীবন আমাকে একটা কঠিন পাঠ দিয়েছে, যেটা আমি কখনো ভুলব না।

সেই পাঠটা এসেছিল সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে। মোবাইল চুরির একটা মিথ্যা মামলায় আমাকে জেলে যেতে হয়েছিল। এই একটা বাক্য লিখতে গিয়েও বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে। কারণ সেই মামলাটা এনেছিল কারা? আমার সবচেয়ে কাছের মানুষরা। যাদের বছরের পর বছর খাইয়েছি, চাকরি দিয়েছি, হজ করিয়েছি, বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছি, তারাই আমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।

আমার সহকারী, ড্রাইভার, ম্যানেজার, ব্যক্তিগত পিএস, এরা আমার আবেগ নিয়ে খেলেছে, আমার সম্পদ লুট করেছে, আমার সন্তানকে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। আজ তারা আমার টাকায় গড়া বাড়িতে থাকে, কোটি টাকার মালিক। আর আমি তাদের করা মামলায় আদালতের সিঁড়ি ভাঙি। জীবনে এর চেয়ে বড় বিদ্রূপ আর কী হতে পারে? তবু আমি বেঁচে আছি। কোন শক্তি আমাকে ধরে রাখে জানি না। হয়তো এটাই আল্লাহর পরিকল্পনা।

আমি মাঝে মাঝে একা কাবা শরীফের এক কোণায় বসে মনে মনে বলি, মালিক, তুমি তো সব দেখো, তুমি তো বিচারক। আমি তো কারও হক মারিনি, কারও ক্ষতি করিনি, সারা জীবন শুধু দিয়েই গেছি। তাহলে এই অন্যায়গুলো কেন হলো আমার সাথে? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পাই না। কিন্তু একটা শান্তি আসে বুকের ভেতর। মনে হয় তিনি আরও অনেক কিছু দেখাবেন, তাই হয়তো এই ধৈর্যটুকু দিয়েছেন। মানুষের ওপর বিশ্বাস হয়তো কমেছে, কিন্তু আল্লাহর ওপর বিশ্বাস একটুও কমেনি।

আমি রাজনীতি বুঝি। মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা আজও আছে, দেশকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্নও মরেনি। কিন্তু মানুষের ভিড়ে মিশে রাজনীতি করার ইচ্ছা আর সাহস দুটোই কমে গেছে। কারণ আমি দেখেছি, যাদের জন্য লড়াই করো, তারাই একদিন পিঠে ছুরি মারে। তখন প্রশ্ন আসে, কাদের জন্য করব? কেন করব? যদি শেষমেশ শুধু আদালতের সিঁড়িই ভাঙতে হয়, তাহলে এই পথের মানে কী? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কিন্তু আমি জানি, ভেতরের মানুষটা এখনো থেমে নেই। থামার কথাও ভাবে না।

কারণ একটাই। আমার ভেতরের মানুষটা এখনো ভালো থাকতে চায়, এখনো সাহায্য করতে চায়, এখনো বিশ্বাস করতে চায়। শুধু এখন সে একটু সাবধান। একটু দূরত্ব রেখে ভালোবাসতে শিখেছে।

আমি বদলাইনি। আমাকে বদলাতে বাধ্য করেছে কিছু মানুষ, কিছু অভিজ্ঞতা, কিছু বিশ্বাসঘাতকতা। আমি আজও ভালোবাসি, কিন্তু নিজেকে হারিয়ে নয়। আমি আজও সাহায্য করি, কিন্তু নিজের প্রতি অন্যায় করে নয়। আমি শিখেছি, ভালো মানুষ হওয়া সুন্দর, কিন্তু নিজের প্রতি অন্যায় করা কখনোই ভালোত্ব নয়।

মানুষের প্রতি ভালোবাসাটা শেষ হয়নি। শুধু একটু সাবধান হয়েছি।

লেখক : রাজনীতিক ও সমাজকর্মী

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আইভীকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

গাজায় বিয়ের অনুষ্ঠানে ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৫

সরকারি দলের বৈঠক / এমপি-মন্ত্রীদের জনগণের কাছে সরকারি সেবার সুফল পৌঁছানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল: কেমন হতে পারে ব্রাজিলের সম্ভাব্য যাত্রা

গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল: কেমন হতে পারে আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য যাত্রা

বুবলীর মা হওয়ার খবরে স্মিতার কড়া সমালোচনা

বাংলাদেশের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিল ভারত

যুবলীগ-ছাত্রলীগের ১৩ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে যাত্রীবোঝাই বাস

বারে ৩ বার বল লাগলে গোল, চোটের ভান করলেই শাস্তি?

১০

‘এনসিপিকে জামায়াতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে’

১১

ঐতি‌হ্যে সমৃদ্ধ দামুড়হুদার প্রাণ‌কে‌ন্দ্র, তবুও উন্নীত হয়‌নি পৌরসভায় 

১২

শরীয়তপুরে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আনন্দ শোভাযাত্রায় দুর্ঘটনা, আহত ৪

১৩

দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনায় যোগ দিলেন ব্রাজিল সমর্থক

১৪

দালালকে ধরে হাসপাতালের ড্রেন পরিষ্কার করাল ছাত্রদল

১৫

ইরানের হাতে এখনও ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে : ট্রাম্প

১৬

হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম কমলো বিশ্ববাজারে 

১৭

দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য বড় সুখবর

১৮

পদ্মায় ডুবে যাওয়া সেই বাসের চালকসহ গ্রেপ্তার ৩

১৯

ঢাবি ট্রেজারারকে ‘পাড়ার গুন্ডা-মাস্তানের’ মতো কথা না বলার অনুরোধ সর্ব মিত্র চাকমার

২০
X