

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এক অনন্য আধার। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচাতো ভাই এবং জামাতা হজরত আলী (রা.) পবিত্র কাবার অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর জীবন, আদর্শ এবং মূল্যবান বাণীসমূহ কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। নিচে তাঁর প্রজ্ঞাময় জীবন থেকে সংকলিত ১৫টি অনুপ্রেরণামূলক বাণী তুলে ধরা হলো:
১. ফিতনার ঝড়ে নাজাতের নৌকা: সমাজের চারদিকে যখন ফিতনা-ফ্যাসাদের ঝড় ওঠে, তখন নিজেকে রক্ষা করতে ‘নাজাতের নৌকা’ বা মুক্তির পথ খুঁজে নিতে হবে। অহংকারের মুকুট মাথা থেকে নামিয়ে রেখে যারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে ন্যায়ের পথে থাকে, দিনশেষে তারাই সফলকাম হয়। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ৫)
২. পাহাড় টললেও ঈমান যেন না টলে: মুমিনের মনোবল হবে পাহাড়ের মতো দৃঢ়। তিনি বলতেন, পাহাড় হয়তো তার জায়গা থেকে সরে যেতে পারে, কিন্তু সত্যের পথ থেকে তোমার পা যেন এক চুলও না নড়ে। দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাও এবং বিশ্বাস রাখো যে, সাহায্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ১১)
৩. গোনাহ আর তাকওয়ার তফাত: গোনাহ বা পাপ হলো এক অবাধ্য ঘোড়ার মতো, যা তার সওয়ারিকে নিয়ে সোজা জাহান্নামের আগুনে ঝাঁপ দেয়। বিপরীতে তাকওয়া বা খোদাভীতি হলো একটি প্রশিক্ষিত শান্ত ঘোড়া, যা তার সওয়ারিকে পরম যত্নে জান্নাতের দুয়ারে পৌঁছে দেয়। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ১৬)
৪. কোরআনের গভীরতা বুঝুন: পবিত্র কোরআনের ভাষা যেমন চমৎকার, এর ভেতরের অর্থও তেমনি গভীর। আলীর (রা.) মতে, কোরআনের বিস্ময়কর রহস্যগুলো কখনো শেষ হওয়ার নয়; এর কোনো জট খুলতে হলে কুরআনের সাহায্যই নিতে হবে। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ১৮)
৫. হেদায়েতের আলো: দুনিয়ার মোহে পড়ে আমরা অনেক সময় আসল সত্য দেখতে পাই না। কিন্তু মৃত্যুর পর যখন চোখের সামনের পর্দা সরে যাবে, তখন আর আফসোস করে লাভ হবে না। তাই সময় থাকতেই সত্যের ডাক শুনে হেদায়েতের পথে চলা বুদ্ধিমানের কাজ। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ২০)
৬. গন্তব্য যখন আখেরাত: মনে রাখবেন, আপনার আসল গন্তব্য কিন্তু আপনার সামনেই (আখেরাত), আর মৃত্যু আপনার পেছনে তাড়া করে ফিরছে। তাই নিজেকে পাপের বোঝা থেকে হালকা রাখুন, যাতে দ্রুত জান্নাতের পথে এগিয়ে যেতে পারেন। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ২১)
৭. আত্মীয়র বিপদে পাশে দাঁড়ান: আপনার কোনো আত্মীয় যদি অভাবী হয়, তবে হাত গুটিয়ে রাখবেন না। আজ আপনি সাহায্য করলে কাল বিপদে পড়লে আপনিও দশটা হাত বাড়িয়ে পাবেন। মনে রাখবেন, মানুষের সাথে মিষ্টি ব্যবহারই মানুষের মন জয়ের আসল চাবিকাঠি। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ২৩)
৮. আল্লাহর রহমতের ছায়ায় আশ্রয়: আল্লাহর গজব থেকে বাঁচতে হলে তাঁর রহমতের আঁচল তলে আশ্রয় নিন। তিনি যে সহজ-সরল পথ দেখিয়েছেন, তাতে অটল থাকলে দুনিয়াতে দেরি হলেও আখেরাতে আপনার কামিয়াবি নিশ্চিত। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ২৪)
৯. সত্য আর সততা হলো যমজ ভাই: সত্য কথা বলা আর ওয়াদা পূরণ করা হলো যমজ ভাইয়ের মতো। এই গুণগুলোই হলো পাপের বিরুদ্ধে লড়ার সবচেয়ে বড় ঢাল। যারা পরকালকে বিশ্বাস করে, তারা কখনো কারো সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ৪১)
১০. দুনিয়ার গোলাম নয়, আখেরাতের সন্তান হোন: দুনিয়া খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, আর আখেরাত এগিয়ে আসছে। আমরা যেন দুনিয়ার মোহে অন্ধ না হয়ে আখেরাতমুখী হই। মনে রাখবেন, আজ হলো আমল করার দিন (হিসাব নেই), আর কাল হলো হিসাব দেওয়ার দিন (আমল করার সুযোগ নেই)। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ৪২)
১১. দুনিয়া যেন গাছের ছায়া: এই দুনিয়াটা হলো অনেকটা গাছের ছায়ার মতো; এই আছে তো এই নেই। এখানে মানুষ কেবল পরীক্ষার জন্য আসে। বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তিই, যে দুনিয়ার চাকচিক্যে না ভুলে পরকালের জন্য নেক আমলের পুঁজি গোছায়। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ৬৩)
১২. শেষ সফরের প্রস্তুতি: আমরা সবাই এই দুনিয়ায় মুসাফির। যমদূত আমাদের মাথার ওপর ঘুরছে। তাই আখেরাতের সফরের জন্য এখনই তৈরি হোন। ঘুম থেকে জেগে ওঠার আগেই তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে আসুন। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ৬৪)
১৩. সম্মানের পথ চেনা: কোনো প্রজ্ঞার কথা শুনলে তা হৃদয়ে গেঁথে নিন। হেদায়েতের পথে চলাই হলো প্রকৃত সম্মানের পথ। যে ব্যক্তি নিজের সময়ের সদ্ব্যবহার করে এবং নেক আমল নিয়ে কবরে যেতে পারে, সেই হলো আসল বিজয়ী। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ৭৬)
১৪. নিজের নসিহতকারী নিজে হোন: মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় হিতাকাঙ্ক্ষী হলো সে নিজে, যদি সে আল্লাহর অনুগত হয়। পক্ষান্তরে যে নিজের নফসের গোলামি করে, সে নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু। সবসময় মনে রাখবেন, সামান্য লোকদেখানো ইবাদত বা লোকদেখানো কাজও কিন্তু শিরকের শামিল। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ৮৬)
১৫. আল্লাহ সব জানেন: সাগরের তলায় কী আছে কিংবা অন্ধকারের গভীরে কী লুকিয়ে আছে—সবই আল্লাহর জানা। আপনার হৃদয়ের হাহাকার আর চোখের পানিও তাঁর অজানা নয়। তাই সব অভাব-অনটনে কেবল তাঁর কাছেই হাত পাতুন এবং মানুষের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে মুক্তি চান। (নাহজুল বালাগা: খুতবা ৯১)