

পৃথিবীতে মানুষের চলার পথে সবচেয়ে বড় বাধা এবং চিরশত্রু হলো শয়তান। সে কেবল আমাদের আধ্যাত্মিক ক্ষতিই করে না, বরং শারীরিক, মানসিক এবং আবেগীয়ভাবেও আমাদের ধ্বংস করতে চায়। শয়তান আমাদের দুর্বলতাগুলো খুব ভালো করে জানে এবং প্রতিটি সুযোগে সেগুলোকে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য দিনরাত ষড়যন্ত্র করে। সে কখনোই বিশ্রাম নেয় না এবং মানুষের সবচেয়ে নাজুক সময়ের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার শয়তানকে আমাদের ‘প্রকাশ্য শত্রু’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সুরা বাকারা: ১৬৮,২০৮, সুরা আনআম: ১৪২)
শয়তানের একমাত্র লক্ষ্য হলো মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে জাহান্নামের সঙ্গী করা। তাই শয়তানকে পরাজিত করতে এবং নিজেকে আল্লাহর পথে অবিচল রাখতে নিচের ১০টি কাজ থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে:
১. অতিরিক্ত দুনিয়াপ্রীতি: দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষকে তার সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য ভুলিয়ে দেয়। শয়তান চায় আমরা যেন কেবল পার্থিব সুখের পেছনে ছুটি এবং পরকালকে ভুলে যাই।
২. মৃত্যুকে স্মরণ না করা: মৃত্যুকে ভুলে গেলে মানুষের হৃদয় কঠোর হয়ে যায় এবং দুনিয়ার প্রতি আসক্তি বাড়ে। পক্ষান্তরে মৃত্যুকে স্মরণ করলে মানুষ জীবনের নশ্বরতা বুঝতে পারে এবং বিপদে ধৈর্যশীল হয়, যা শয়তানকে খুশি হতে দেয় না।
৩. কৃপণতা: দান-সদকাহ করার সময় শয়তান মানুষের মনে দারিদ্র্যের ভয় জাগিয়ে তোলে এবং সম্পদ জমা করতে প্ররোচিত করে। কৃপণতা সম্পদ থেকে আল্লাহর বরকত কমিয়ে দেয় এবং মানুষের মনে দুনিয়ার প্রতি আসক্তি বাড়িয়ে শয়তানের জয় নিশ্চিত করে।
৪. কিবর বা অহংকার: অহংকার ইবলিসের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল, যার কারণে সে অভিশপ্ত ও জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন যে, যার অন্তরে সরিষা দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না (সহিহ মুসলিম)।
৫. লোকদেখানো ইবাদত: কোনো ভালো কাজ করার সময় যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছা থাকে, তবে তা শয়তানের প্রিয় কাজ। এই মানসিকতা ইবাদতের আধ্যাত্মিকতা ও নেকি নষ্ট করে দেয়।
৬. তকদিরে অসন্তুষ্টি: জীবনে বিপদ বা দুর্যোগ আসলে ধৈর্য হারিয়ে আল্লাহর ফয়সালার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করা শয়তানের একটি বড় ফাঁদ। যখন মানুষ রাগের মাথায় ‘কেন আমার সাথেই এমন হলো’ বলে প্রশ্ন করে, তখন শয়তান তাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আরও বড় ভুলের দিকে ঠেলে দেয়।
৭. কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ: নিজের নফস বা মনের সব ইচ্ছা পূরণ করতে চাওয়া দুর্নীতির পথ খুলে দেয়। এটি মানুষকে ফজরের সময় ঘুমানো, গীবত করা বা হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার মতো মন্দ কাজের দিকে ধাবিত করে।
৮. সর্বদা নেতিবাচক চিন্তা করা: জীবনের প্রতিটি বিষয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে অকৃতজ্ঞ করে তোলে। শয়তানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ করা, তাই আমাদের সর্বদা শোকরগুজার থাকা উচিত।
৯. গোনাহকে তুচ্ছ মনে করা: ছোট ছোট গুনাহকে গুরুত্ব না দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। গুনাহকে যত তুচ্ছ মনে করা হবে, শয়তান মানুষের তত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়বে এবং তাকে বড় পাপের পথে নিয়ে যাবে।
১০. আত্মতুষ্টি বা নিজেকে নিরাপদ ভাবা: নিজের ভালো আমল নিয়ে গর্ব করা এবং মনে করা যে, ‘আমি অবশ্যই জান্নাতি’ অথবা ‘আমি আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপদ’; এটি একটি শয়তানি ধোঁকা। কোনো মানুষই জানে না তার শেষ পরিণতি কী হবে, তাই সর্বদা বিনয়ী থেকে আল্লাহর রহমতের আশা করা এবং তওবা করা উচিত।
শেষকথা
শয়তানের মূল শক্তি কেবল তার কুমন্ত্রণা ও মিথ্যা প্রলোভন। আমরা যদি সচেতনভাবে এই কাজগুলো এড়িয়ে চলি এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি, তবে শয়তান আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। ঈমানের দৃঢ়তা আর বিনয়ই হলো শয়তানকে পরাজিত করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
তথ্যসূত্র: দ্য মুসলিম ভাইব