

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপানি কৌতুকাভিনেতা মাৎসুবারা তানিশি এমন সব বাড়িতে বসবাস করছেন, যেখানে আগের বাসিন্দারা নির্মম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন। এগুলো মধ্যে একটি বাড়ির ভাড়াটিয়া তার নিজের ভাইকে খুন করেছিলেন। অন্য একটিতে এক নারী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তৃতীয় একটি বাড়িতে এক বৃদ্ধ একাকী মারা যান এবং দুই বছর ধরে তার মরদেহটি সেখানে অবহেলায় পড়ে ছিল। মাৎসুবারা বলেন, ‘আমি আগে ভাবতাম আমি হয়তো কোনো অভিশাপের মুখে পড়ব, কিন্তু না, এমন সমস্যায় আমি পড়িনি।’
জাপানে এই ধরনের বাড়িগুলোকে ‘জিকো বুক্কেন’ বা ‘দুর্ঘটনাকবলিত সম্পত্তি’ বলা হয়। যদিও অনেকে এই ধরনের বাড়িতে থাকার কথা ভাবলেই শিউরে ওঠেন, তবুও এগুলো দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের মাঝে এক তীব্র কৌতূহল তৈরি করে রেখেছে। মাৎসুবারা এই ধরনের ডজনখানেক বাড়িতে থেকে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন; তার স্মৃতিচারণমূলক বইগুলো বেস্ট-সেলার হয়েছে এবং সেগুলো থেকে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।
বর্তমানে আবাসন খরচ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এই সম্পত্তিগুলো এখন আর আগের মতো অপছন্দের তালিকায় নেই। পূর্ববর্তী বাসিন্দার মৃত্যুর ধরন কতটা ভয়াবহ ছিল, তার ওপর ভিত্তি করে এই দুর্ঘটনাকবলিত সম্পত্তিগুলোর দাম বাজারমূল্যের চেয়ে ১০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কম হয়ে থাকে। অন্য দেশগুলোতেও অবশ্য এই ধরনের ছাড়ের প্রচলন রয়েছে, তবে জাপানে এগুলোকে ঘিরে গড়ে ওঠা সংস্কৃতিটি বেশ বিস্তৃত ও সুবিন্যস্ত। মূলত দাম কম হওয়ায় এসব সম্পিত্তির চাহিদা দিনদিন বাড়ছে।
ওশিমা তেরু নামের এক সম্পত্তি বিনিয়োগকারী দেশজুড়ে থাকা 'জিকো বুক্কেন'গুলোর একটি জনপ্রিয় অনলাইন মানচিত্র (ম্যাপ) পরিচালনা করেন। সেখানে প্রতিটি বাড়ির ওপর একটি আগুনের আইকন এবং মৃত্যুর বিবরণ দেওয়া থাকে।
জাপানে খুব কম মানুষই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী। তারপরও বিশ্বাসের দিক থেকে জাপান বেশ কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি দেশ। ২০২৪ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশ জাপানি নাগরিক ভূত-প্রেত বা আত্মায় বিশ্বাস করেন। সামাজিকমাধ্যমগুলোতে এই দুর্ঘটনা কবলিত বাড়িগুলো ভূত-প্রেতের গল্পে সয়লাব। কিছু প্রতিষ্ঠান আবার মানুষের এই ভয়কে পুঁজি করেই ব্যবসা করছে।
যেমন- বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ঘর পবিত্র করার আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। টোকিওর 'কাচিমোদে' নামের একটি প্রতিষ্ঠান থার্মাল ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির সাহায্যে 'জিকো বুক্কেন'গুলো পরীক্ষা করে; তাদের দাবি, তারা অলৌকিক বা প্যারানরমাল কর্মকাণ্ডের লক্ষণ খোঁজেন। যদি কোনো লক্ষণ না পাওয়া যায়, তবে তারা বাড়িটি ভুতুড়ে নয় বলে একটি সনদপত্র বা সার্টিফিকেট ইস্যু করে।
দেশের জনসংখ্যার পরিবর্তনও এই ধরনের সম্পত্তিগুলোকে আকর্ষণীয় করে তুলছে। সরকার ২০২৫ সালে ২০,০০০-এরও বেশি ‘কোদোকুশি’ বা ‘নিঃসঙ্গ মৃত্যু’র রেকর্ড করেছে; যেখানে বলা হয়েছে, কোনো মানুষ একা মারা যাওয়ার পর অন্তত আট দিন পর্যন্ত কেউ তা জানতে না পারলে সেটি নিঃসঙ্গ মৃত্যু।
২০২১ সালে সরকার একটি নির্দেশিকা জারি করে জানায় যে, বিশেষ কোনো পরিস্থিতি (যেমন লাশে পচন ধরা) ছাড়া বাড়িওয়ালাদের এই ধরনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য বাড়ি ভাড়া নেওয়া যেন সহজ হয়, সেই উদ্দেশ্যেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল; কারণ অনেক বাড়িওয়ালাই ভয় পান যে তাদের বাড়িতে কোনো নিঃসঙ্গ মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে।
কোবে শহরের 'জিকো বুক্কেন' কেন্দ্রিক একটি প্রোপার্টি ফার্মের পরিচালক নিকি হিদেনোরি বলেন, এখন অনেক ভাড়াটিয়াই ‘দাম বিবেচনা করে একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি বেছে নিচ্ছেন।’ গত মার্চ মাসে সেন্ট্রাল টোকিওতে স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের গড় ভাড়া গত বছরের তুলনায় ১৩% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা টানা ২২ মাসের জন্য একটি রেকর্ড উচ্চতা। সাম্প্রতিক একটি জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ জাপানি নাগরিকই এখন ‘জিকো বুক্কেন’-এ থাকার বিষয়টি বিবেচনা করতে রাজি আছেন।
বিনিয়োগকারীরাও এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন; আইনগতভাবে, মৃত্যুর পর তিন বছর পার হয়ে গেলে সেই তথ্য আর প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা থাকে না। ফলে কম দামে কেনা একটি সম্পত্তি পরবর্তীতে পুরো বাজারমূল্যেই বিক্রি করা সম্ভব।
মাৎসুবারা জানান, তিনি কখনো ভূত দেখেননি, তবে তার মাঝে ঘুমের মধ্যে হাঁটার (স্লিপওয়াকিং) অভ্যাস তৈরি হয়েছে। তিনি এর জন্য কোনো ক্ষতিকর আত্মাকে দায়ী করেন না। বরং তার ধারণা, বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের জায়গায় বসবাসের ফলে তার ওপর একটি মানসিক প্রভাব পড়েছে। টোকিওর এক ‘জিকো বুক্কেন’-এ বসবাসরত রিউয়া নামের এক তরুণী অবশ্য নিজেই এই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, ‘যখন বন্ধুরা বেড়াতে আসে, তখন তারা বেশ ঘাবড়ে যায় এবং তাড়াহুড়ো করে চলে যায়। বিষয়টা একটু দুঃখজনক।’
সূত্র: দ্য ইকোনোমিস্ট।