

গণপরিবহনে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল প্রতিবেশী দেশ ভারত। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করলেন ভারতের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন। সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এই পরিবেশবান্ধব ট্রেনটি হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত রুটে চলাচলের মাধ্যমে ভারতের রেল খাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। জার্মানি, জাপান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোর পর এবার হাইড্রোজেন প্রযুক্তির এলিট ক্লাবে যুক্ত হলো ভারত।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনের উদ্বোধন করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ট্রেনটি হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত রুটে চলাচল করবে। রুটটির দৈর্ঘ্য ৮৯ কিলোমিটার। এটি পরিচালনা করবে নর্দার্ন রেলওয়ে।
ভারতে প্রথমবারের মতো হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এই ট্রেনে। এই প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, যা ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় আরও পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রকল্পটির আওতায় হাইড্রোজেন সংরক্ষণ ও পুনরায় জ্বালানি ভরার (রিফুয়েলিং) অবকাঠামোও তৈরি করা হয়েছে।
উদ্বোধনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন চালু করার মাধ্যমে ভারত এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা কয়েকটি দেশের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। রেল খাতে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু হওয়া এই ট্রেনের মাধ্যমে হাইড্রোজেন প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভারতে পরিবেশবান্ধব রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনাতেও এটি সহায়ক হবে।
ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
ভারতের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনটি আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব এই ট্রেনটি হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত রুটে চলাচল করবে। ট্রেনটির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
ট্রেনটি জিন্দ জংশন, গোহানা জংশন ও সোনিপতকে সংযুক্ত করবে এবং পথে বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রী ওঠানামার সুযোগ থাকবে।
প্রস্তাবিত স্টপেজগুলোর মধ্যে রয়েছে, জিন্দ সিটি, পান্ডু পিন্ডারা জংশন, লালিত খেরা হল্ট, ভামভেবা, ইসাপুর খেরি হল্ট, বুটানে হল্ট, খান্দরাই হল্ট, রাবরাহ হল্ট, লাথ হল্ট, মোহানা, বারওয়াসনি হল্ট এবং সোনিপত নিউ।
রেল খাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যে এই হাইড্রোজেন ট্রেনকে ভারতের পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন ব্যবহারে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হলো ভারত
ভারতের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন চালুর মাধ্যমে দেশটি হাইড্রোজেনভিত্তিক রেল পরিবহন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা বিশ্বের কয়েকটি দেশের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এর আগে জার্মানি, জাপান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ এই প্রযুক্তি নিয়ে এগিয়ে গেছে।
বিশ্বের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করে জার্মানি। দেশটির তৈরি আলস্টম কোরাডিয়া আইলিন্ট ট্রেনটি হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তিতে পরিচালিত হয়।
২০২২ সালে ট্রেনটি একবারও জ্বালানি না ভরে ১ হাজার ১৭৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রেকর্ড তৈরি করে। জার্মানির লোয়ার স্যাক্সনি অঞ্চলের ব্রেমারভোর্দে রুটে ডিজেলচালিত ট্রেনের পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে এই ট্রেন চালু করা হয়।
এছাড়া জার্মানির স্যুডওস্টবায়ার্নবাহন নেটওয়ার্কে আরও তিনটি হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ট্রেনে ছাদে স্থাপিত ফুয়েল সেল ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহার করা হবে।
জাপান ২০২৭ অর্থবছরের শেষ নাগাদ প্রথম হাইড্রোজেন হাইব্রিড ট্রেন চালুর পরিকল্পনা করছে। ‘হাইবারি’ নামের এই ট্রেনটি টোকিওর কাছে কানাগাওয়া প্রিফেকচারের সুরুমি ও নাম্বু লাইনে চলবে বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রথম হাইড্রোজেনচালিত যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করা হয়। ‘জেমু’ নামে পরিচিত এই ট্রেনটি সান বার্নার্ডিনো এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়।
হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রেল পরিবহনে কার্বন নিঃসরণ কমানোর একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে।