

হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর ইরানের প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালানোর দাবি করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। পাল্টা জবাবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
সপ্তাহের শুরুতে ওমানের জলসীমা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপারিশ করা পথ দিয়ে হরমুজ অতিক্রমের সময় তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর সোমবার সাইপ্রাসের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এমভি জিএফএস গ্যালাক্সিতেও হামলা চালানো হয়।
সেন্টকম জানায়, হামলায় জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে নাবিকদের লাইফবোটে আশ্রয় নিতে হয়। একজন নাবিক এখনো নিখোঁজ।
এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, সমঝোতা স্মারক মেনে চলার জন্য ইরানকে আরেকটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু তারা তা লঙ্ঘন করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন তাদের এর মূল্য দিতে হবে।
অন্যদিকে আইআরজিসির দাবি, জাহাজটি বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে অনুমোদিত পথ ছেড়ে যায় এবং ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। এরপর সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হয় এবং পরে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে সেটিকে থামানো হয়।
এরপরই ইরান ঘোষণা দেয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। আইআরজিসি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তু হবে।
উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির বরাতে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোলাবারুদের গুদাম ও রাডার স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাহরাইনের একটি মার্কিন যোগাযোগ ও রাডার স্থাপনাতেও হামলার দাবি করেছে তারা।
আইআরজিসি জানিয়েছে, কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, এতে একটি যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও একটি কমান্ড সেন্টার ধ্বংস হয়েছে।
তবে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
এ ছাড়া আইআরজিসি দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে দ্বিতীয় একটি বাণিজ্যিক জাহাজও তারা থামিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
৩০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি সেন্টকমের
সেন্টকম জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে ইরানে তাদের তৃতীয় দফার অভিযান শেষ হয়েছে। সর্বশেষ অভিযানে প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, নৌঘাঁটি, গোলাবারুদের গুদাম, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনা রয়েছে।
তাদের দাবি, তিন রাতে ৩০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে হরমুজে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সেন্টকম আরও জানিয়েছে, মে মাসের শুরু থেকে তাদের বাহিনী ৮০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হতে সহায়তা করেছে। এসব জাহাজে প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছিল।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে বর্তমান সংঘাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সেই যুদ্ধবিরতি এখন কার্যত শেষ। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চুক্তি ভঙ্গের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন।
তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং মধ্যস্থতাকারীরা নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে মার্কিন কয়েকটি গণমাধ্যমের দাবি, ট্যাংকারে হামলাকে ‘ভুল’ বলে উল্লেখ করে ইরান গোপনে ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে, দেশটির নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা একটি উগ্র গোষ্ঠী ওই হামলার জন্য দায়ী।
সূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স