

প্রায় ১৮ মাস ধরে সবকিছু ঘটে যাচ্ছে। সুদানের দারফুর অঞ্চলের আল ফাশের শহর মিলিশিয়া বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (আরএসএফ) অনেক দিন ঘেরাও করে রেখেছিল। গত সপ্তাহে শহরটিতে এ বাহিনী ঢুকে পড়ে এবং তারপর যা ঘটেছে, তাকে এক কথায় বলা যায় মহাবিপর্যয়। সেখানে নির্বিচার গণহত্যা চলছে। একটি হাসপাতালেই প্রায় ৫০০ মানুষ হত্যা করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রোগী ও তাদের পরিবারের লোকজনও আছে, যারা পালাতে পেরেছেন তারা জানিয়েছেন, সেখানে একেবারে সাধারণ নাগরিকদের বাছবিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে।
আরএসএফ এত নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা করছে যে, কৃত্রিম উপগ্রহ থেকেও জমিতে জমে থাকা রক্ত দেখা গেছে। আল ফাশের পতনের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার গণহত্যার গতি ও তীব্রতাকে রুয়ান্ডার গণহত্যার প্রথম ২৪ ঘণ্টার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। আল ফাশের ছিল সুদানের সেনাবাহিনীর দারফুর শেষ শক্তিকেন্দ্র। আর গত সপ্তাহটি সুদান যুদ্ধে একটি গুরুতর পরিবর্তনের সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এখন এ যুদ্ধে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী এসএএফ এবং মিলিশিয়া বাহিনী আরএসএফ দেশের নিয়ন্ত্রণের জন্য নিষ্ঠুর ও অবিরাম লড়াই চালাচ্ছে।
সোমবারও এক অনুষ্ঠানে ড্রোন হামলা চালিয়ে অন্তত ৪০ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এসব গণহত্যার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। সোমবার জাতিসংঘ বলেছে, সুদানে সরকারি বাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে চলমান সংঘাত দারফুর থেকে পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে গত এক সপ্তাহে দারফুরের পূর্বে অবস্থিত কোরদোফান অঞ্চলের বিভিন্ন শহর ও গ্রাম থেকে অন্তত ৩৬ হাজারের বেশি সাধারণ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পালিয়ে গেছেন।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত ২৬ থেকে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে উত্তর কোরদোফানের পাঁচটি এলাকায় মোট ৩৬ হাজার ৮২৫ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সংঘাতের কেন্দ্রীয় এলাকা এখন উত্তর কোরদোফান, যা পশ্চিমের দারফুর অঞ্চলকে পূর্বদিকের রাজধানী খার্তুমের সঙ্গে যুক্ত করে। এ অঞ্চলটি সামরিকভাবে অত্যন্ত কৌশলগত—দারফুর ও নদীঘেঁষা খার্তুম অঞ্চলের মধ্যে এক ধরনের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে এটি।
জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। হাজার হাজার পরিবার সব হারিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালাচ্ছেন। এদিকে, জাতিসংঘের আফ্রিকাবিষয়ক সহকারী মহাসচিব মার্থা পোবি সতর্ক করে বলেছেন, বারা ও আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ এবং জাতিগত প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কা বাড়ছে। তিনি সংঘাতের দুপক্ষকে মানবিক করিডোর খোলার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে জরুরি সহায়তা ও ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়।
জাতিসংঘের মতে, ২০২৩ সালের এপ্রিলে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সুদানে এরই মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
সোমবার জাতিসংঘ সমর্থিত বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষক সংস্থা জানিয়েছে, দারফুর অঞ্চলের আল-ফাশের এবং দক্ষিণের কাদুগলি শহরে দুর্ভিক্ষের সব আলামত পাওয়া গেছে। আইপিসি প্রথমবারের মতো এই দুই শহরে ‘দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি’ ঘোষণা করেছে। এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আল-ফাশেরের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে দুর্ভিক্ষের আলামত পেয়েছিল তারা। এদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত জানিয়েছে, আল-ফাশের পতনের পর সংঘটিত গণহত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে তারা প্রমাণ সংগ্রহ করছে।
মন্তব্য করুন