

২০২৬ সালের ১০ জুন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মেয়াদ প্রথম বিশ্বযুদ্ধকেও ছাড়িয়ে যাবে। শুরুতে যে সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, সেটাই পরিণত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। আজকের বাস্তবতায় ইউক্রেন আত্মসমর্পণে রাজি নয়, আর রাশিয়াও জানে না কীভাবে জিততে হবে। একনায়কতান্ত্রিক শাসনেও ‘জয়ের তত্ত্ব’ ছাড়া যুদ্ধ চালানো বিপজ্জনক। ইতিহাস বলে, শেষ পর্যন্ত এর মূল্য দিতে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার দ্বিতীয় নিকোলাস যেমন শিখেছিলেন, তেমনি আজ ভ্লাদিমির পুতিনের সামনেও সেই ঝুঁকি। অকারণে যত বেশি রুশ প্রাণ ঝরছে, ভবিষ্যতের সংকট তত গভীর হচ্ছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি: ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ ওডেসা অঞ্চলে হামলা আরও বাড়িয়েছে রাশিয়া। ধারাবাহিক এ হামলায় ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে এবং এ অঞ্চলের সামুদ্রিক অবকাঠামো মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় ওডেসার বন্দর এলাকায় হামলা চালানো হয়। এতে একটি বেসামরিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক গভর্নর। ইউক্রেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ওলেক্সি কুলেবা বলেছেন, মস্কো ওডেসা অঞ্চলে পদ্ধতিগতভাবে হামলা চালাচ্ছে। গত সপ্তাহেই তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, যুদ্ধের মূল কেন্দ্রবিন্দু ওডেসার দিকে সরে যেতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, এ লাগাতার হামলার লক্ষ্য হলো ইউক্রেনকে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ও লজিস্টিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা।
চলতি মাসের শুরুতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হুমকি দিয়েছিলেন, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর ট্যাংকারে ড্রোন হামলার জবাবে ইউক্রেনের সমুদ্রে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হবে। ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বলতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত শত শত রুশ তেলবাহী জাহাজকে বোঝানো হয়।
রোববার রাতে চালানো হামলায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে একটি বড় বন্দরে আগুন ধরে যায়, যেখানে ময়দা ও ভোজ্যতেলের ডজনখানেক কনটেইনার পুড়ে যায়। এরপর সোমবারও হামলা হয়। এতে শিশুসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এভাবে সাম্প্রতিক কয়েকদিনে শতাধিক হামলা চালানো হয়। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।
জেলেনস্কি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবাহিনীর এক কমান্ডারকে বরখাস্ত করার পর ওডেসা অঞ্চলের জন্য শিগগির নতুন কমান্ডার নিয়োগ দেওয়া হবে।
ইতিহাসগতভাবে ওডেসা বন্দর ইউক্রেনের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিয়েভ ও খারকিভের পর এটি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। জাপোরিঝঝিয়া, খেরসন ও মাইকোলাইভ অঞ্চলের বন্দরগুলো রুশ দখলে থাকায় ওডেসার কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
কিয়েভের প্রতিক্রিয়া: ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে চলমান আলোচনা ‘প্রকৃত ফলের খুব কাছাকাছি’ পৌঁছে গেছে।
ইউক্রেন সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রুস্তম উমেরভের নেতৃত্বে ইউক্রেনীয় আলোচক দল ও ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে যাচ্ছেন, যার মধ্যে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠিত আলোচনাও অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিনিয়োগবিষয়ক দূত ও আলোচক কিরিল দিমিত্রিভও ফ্লোরিডায় মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইউক্রেন ও রাশিয়া—উভয় দেশের কর্মকর্তারাই জানিয়েছেন, আলোচনার ফল সম্পর্কে প্রতিবেদন পেশ করতে তাদের প্রতিনিধিদল নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছে। ইউক্রেনীয় কূটনীতিকদের এক সমাবেশে জেলেনস্কি বলেন, ‘সবকিছুই বেশ সম্মানজনক মনে হচ্ছে... এবং এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি আমাদের (ইউক্রেন) ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষেরই কাজ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আমরা একটি প্রকৃত ফলের খুব কাছাকাছি রয়েছি।’
জেলেনস্কি আরও জানান, আলোচকরা মার্কিন প্রতিনিধিদের প্রস্তাবিত ২০ দফার একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে এটি নিয়ে আলোচনা চলছে। এর আগে প্রাথমিক খসড়াটি রাশিয়ার দিকে বেশি ঝুঁকে আছে—এমন সমালোচনা করে তা প্রত্যাখ্যান করেছিল ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয়রা। তিনি বলেন, এর সবকিছু আদর্শিক না হলেও একটি পরিকল্পনা অন্তত আছে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষতি: পুতিনের মূল সমস্যা হলো, তিনি এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনকে হারাতে পারেননি। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে রাশিয়ার তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় আক্রমণ ব্যর্থ হয়েছে। ছোট ছোট দলে সেনা পাঠিয়ে আক্রমণ চালানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও অগ্রগতি হলেও তা ধরে রাখার মতো শক্তি নেই। সেনা জড়ো হলেই ইউক্রেনীয় হামলায় তা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
সংখ্যাই এই বাস্তবতা তুলে ধরে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত রাশিয়ার হতাহতের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে ৯ লাখ ৮৪ হাজার থেকে ১৪ লাখ ৩৮ হাজারের মধ্যে কোথাও পৌঁছেছে। নিহতের সংখ্যা আনুমানিক ১ লাখ ৯০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার।
ধারণা করা হচ্ছে, প্রতি ইউক্রেনীয় সেনার বিপরীতে পাঁচজন রুশ সেনা মারা যাচ্ছেন। অথচ এত ক্ষয়ক্ষতির পরও রাশিয়া একটি বড় শহরও দখল করতে পারেনি। চারটি ওব্লাস্ট পুরোপুরি দখল করতে গেলে আরও অন্তত পাঁচ বছর লাগবে। ২০২৫ সালের হারে যুদ্ধ চললে মোট রুশ হতাহত ৪০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে।
এ অচলাবস্থাই রাশিয়াকে ইউক্রেনের শহর ও অবকাঠামোয় হামলা জোরদার করতে প্ররোচিত করছে। লক্ষ্য—দেশটির অংশবিশেষ বসবাসের অযোগ্য করে তোলা এবং মনোবল ভাঙা। এ শীতকে ‘ধ্বংসাত্মক’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে ইতিহাস বলে, বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা সাধারণত কোনো জাতিকে ভেঙে ফেলে না। বরং প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইউক্রেনীয়দের মনে করিয়ে দেয়, পুতিন জিতলে তারা কত কিছু হারাবে।
এর বিপরীতে, ইউক্রেনের ভেতর থেকে রাশিয়ার গভীরে চালানো হামলা পরিস্থিতি বদলাতে পারে। জরিপে দেখা যায়, ৭০ শতাংশ রুশ নাগরিক যুদ্ধকে সমর্থন করেন বলে দাবি করেন। তবে এদের বড় অংশ বাস্তবতা এড়িয়ে চলেন। জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমানবন্দরে হামলা, অর্থনীতি ধীর হয়ে আসা ও বাজেট সংকোচনের মধ্য দিয়ে ইউক্রেন হয়তো রুশ সমাজকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ভূমিকা: পুতিনের আরেকটি আশা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান। ২০২৫ সালের শুরুতে তিনি সাময়িকভাবে ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে সেই পথ এখন কম সম্ভাব্য। ইউরোপ ইউক্রেনের অর্থনৈতিক বোঝা বহন করছে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত চাপের অভিযোগ অনেকটাই কমেছে। ট্রাম্পও বুঝতে পেরেছেন, ইউক্রেনকে ছেড়ে দিলে তার ‘শান্তিদূত’ ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অক্টোবরে তিনি লুকওয়েল ও রোসনেফটসহ কয়েকটি রুশ তেল কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছেন।
ইউরোপীয় ঐক্য ভেঙে পড়ার আশাও পুতিনের রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের অর্থায়ন সংকটে পড়তে পারে। কিছু দেশে রাশিয়াপন্থি জনতাবাদী শক্তির উত্থানের আশঙ্কাও আছে। বিভক্ত ইউরোপ দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনকে সমর্থন দিতে হিমশিম খেতে পারে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনকে ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন আলাদা। ইউক্রেন ইউরোপীয় নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি—এই যুক্তি এখন অনেকের কাছেই অকাট্য। কিয়েভের পতন হলে পুতিন ইউরোপের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী ও শক্তিশালী অস্ত্রশিল্পের নিয়ন্ত্রণ পাবে। এ কারণে রুশ সম্পদ জব্দ ছাড়াও বহুবর্ষীয় অর্থায়ন কাঠামো গড়ার উদ্যোগ চলছে। তা সফল হলে ইউক্রেনের অর্থনীতি রাশিয়ার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
কী করবেন পুতিন: অনেকে মনে করেন, সময় পুতিনের পক্ষে বলেই তিনি শান্তির পথে হাঁটছেন না; কিন্তু ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা বলছে, নেতারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো অপ্রত্যাশিত মোড়ের অপেক্ষা করেন। তাই ২০২৬ সালেও যুদ্ধ চলার আশঙ্কাই বেশি। পুতিন অপেক্ষা করবেন নতুন সামরিক কৌশল, ইউক্রেনের জনবল সংকট, ভলোদিমির জেলেনস্কির সরকারের পতন, কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ধৈর্য হারানোর জন্য।
কিন্তু যদি এসবের কোনোটিই না ঘটে, তাহলে পুতিন আরও ভয়ংকর সংকট তৈরি করবেন। রাশিয়া তার অর্থনীতি বন্ধক রেখেছে, ফিনল্যান্ড ও সুইডেনকে ন্যাটোতে ঠেলে দিয়েছে, চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়েছে এবং একটি প্রজন্মের তরুণকে যুদ্ধে হারিয়েছে। প্রশ্ন হলো—এর বিনিময়ে কী পেলো? যেদিন এই প্রশ্ন রুশ সমাজে জোরালোভাবে উঠবে, সেদিন বিশ্ব আরও অনিশ্চিত এক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। তখন পুতিন হয়তো পরাজয় মেনে নেবেন অথবা আরও বিপজ্জনক পথে হাঁটবেন।