

ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকার মধ্যেই রাফাহ সীমান্ত আংশিকভাবে ফের চালু হয়েছে। এর ফলে উপত্যকার বাসিন্দারা নতুন জীবনের আশা দেখছেন। সীমান্তটি চালু হওয়ার পর আরও ২৫ ফিলিস্তিনি গাজায় ফিরেছেন। একই সঙ্গে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে কয়েকজন রোগীকে গাজা থেকে সীমান্তের দিকে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিকে, গত বৃহস্পতিবারও গাজাজুড়ে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে দুই বেসামরিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আর রাফাহ ক্রসিং আশা জাগালেও চলাচল সীমিত রয়েছে। গতকাল শুক্রবার ও গত বৃহস্পতিবার আলজাজিরার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাফাহ সীমান্ত ফের আংশিকভাবে চালুর পর গাজায় তৃতীয় দল ফিরে এসেছে। ২৫ জনের এ দলটি স্থানীয় সময় ভোর ৩টায় গাজায় প্রবেশ করে। মিশরের এল আরিশ শহর ছাড়ার প্রায় ২০ ঘণ্টা পর বাসযোগে তাদের দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ফেরত আসা ফিলিস্তিনিদের অনেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত ছিলেন। তারা আলজাজিরার প্রতিবেদকদের জানান, সীমান্ত পার হওয়ার সময় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তারা জিজ্ঞাসাবাদ, অপমান ও দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন।
ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন পর স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং একই সঙ্গে নিজের চোখে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার ভয়াবহ চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। ফেরত আসা ফিলিস্তিনি আইশা বালাউই রয়টার্সকে বলেন, এ অনুভূতিটা আনন্দ আর দুঃখের মাঝামাঝি। পরিবারকে ফিরে পেয়ে আমি খুশি; কিন্তু নিজের দেশের এ ধ্বংস দেখে হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। আমি কখনো কল্পনাও করিনি ধ্বংস এতটা ভয়াবহ হবে। তিনি বলেন, বিদেশে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকলেও মানসিক শান্তি পাইনি। আমার জায়গা ওখানে নয়। আমার জায়গা এখানে, গাজায়।
আলজাজিরা জানিয়েছে, ২৫ ফিলিস্তিনি ফেরত আসার কয়েক ঘণ্টা পরই সাত ফিলিস্তিনি রোগী ও তাদের ১৪ স্বজনকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য রাফাহ সীমান্তের দিকে নেওয়া হয়। আলজাজিরার প্রতিবেদক তারেক আবু আজ্জুম জানান, রোগীদের একটি বাসে করে সীমান্তের মিসরীয় অংশে পাঠানো হয়েছে।
তবে চিকিৎসা স্থানান্তরের গতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আলজাজিরার আরেক প্রতিবেদক হানি মাহমুদ। তিনি জানান, সীমান্ত আংশিক চালুর পর যত রোগী পাঠানোর কথা ছিল, বাস্তবে তার তুলনায় সংখ্যা অনেক কম। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন ৫০ রোগী ও তাদের সঙ্গে দুজন করে স্বজন পাঠানোর কথা থাকলেও এ সপ্তাহে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০ জনের মতো রোগী স্থানান্তর করা হয়েছে।
হানি জানান, এ গতিতে চললে প্রায় ২০ হাজার গুরুতর অসুস্থ রোগীকে স্থানান্তর করতে কমপক্ষে তিন বছর লেগে যাবে। অথচ তাদের অনেকেরই তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের ফলে ২২টি হাসপাতাল সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে এবং অন্তত ১ হাজার ৭০০ চিকিৎসা কর্মী নিহত হয়েছেন।
মিশরের সঙ্গে গাজার একমাত্র প্রবেশ ও বহির্গমন পথ রাফাহ সীমান্ত যুদ্ধের বেশিরভাগ সময়ই ইসরায়েল বন্ধ করে রেখেছিল। গত সোমবার এটি আংশিকভাবে চালু হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া তথাকথিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি শর্ত। তবে কেবল যুদ্ধের সময় গাজা ছেড়ে যাওয়া ফিলিস্তিনিদেরই ফেরার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে এবং উভয় দিকের যাত্রীরাই কঠোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেক নারী আগে আলজাজিরাকে জানান, তাদের চোখ বেঁধে, হাত বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ ও সম্পূর্ণ শরীর তল্লাশি করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার সহায়তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (আইসিএসপিআর) বলছে, ইসরায়েল রাফাহ সীমান্তকে মানবিক করিড়োরের বদলে নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
এদিকে দক্ষিণ গাজায় মানুষ ফেরা ও রোগী স্থানান্তরের মধ্যেই উপত্যকাজুড়ে ইসরায়েলি হামলা চলছে। অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিনগুলোর একটি ছিল বুধবার, এ দিন ২৩ ফিলিস্তিনি নিহত হন।
গত বৃহস্পতিবারও গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। উত্তর গাজায় বৃহস্পতিবার রাতের হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জরুরি সেবা সংস্থাগুলো। নিহতদের মধ্যে জাবালিয়া ও বেইত লাহিয়া শহরের বাসিন্দারা রয়েছেন। শুক্রবার তাদের মরদেহ গাজা শহরের আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার রাতজুড়ে এসব হামলা চালানো হয়। এ নিয়ে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরায়েলের হামলায় ৫৭৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত ও ১ হাজার ৫১৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
একই রাতে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে একটি বাড়িতে হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইনের’ কাছে তাদের সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর জবাবে এই হামলা করা হয়েছে। প্রথম দফার গাজা যুদ্ধবিরতির সময় ওই সীমারেখা বরাবর সেনা মোতায়েন করে ইসরায়েল নিজস্ব একটি বাফার জোন তৈরি করে।
স্থানীয় বাসিন্দা সালেহ আবু হাতাব আলজাজিরাকে বলেন, আধা ঘণ্টার মধ্যেই বাড়িটি খালি করা হয়। সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর সেটিতে বোমা হামলা চালানো হয়। বাড়িটি একটি স্কুলের বিপরীতে অবস্থিত ছিল, যেখানে বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন।
বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় পশ্চিম তীরে সর্বোচ্চ বাস্তুচ্যুতি: জাতিসংঘ
দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও হয়রানির কারণে জানুয়ারি মাসে প্রায় ৭০০ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। এটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এক মাসে সর্বোচ্চ বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা। খবর আলজাজিরার।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানায়, গত মাসে অন্তত ৬৯৪ জন ফিলিস্তিনিকে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।
ইসরায়েলি এনজিও ‘পিস না’-এর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ১৯৬৭ সাল থেকে অবৈধভাবে দখল করে রাখা পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীরা পশুপালনকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে ফিলিস্তিনি কৃষিজমিতে উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করে এবং ধীরে ধীরে স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে এসব এলাকা থেকে বিতাড়িত করে।