

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের এনবিসি নিউজের জনপ্রিয় রাজনৈতিক টকশো ‘মিট দ্য প্রেস’-এ এক উত্তপ্ত সাক্ষাৎকারের মাঝপথে ক্ষুব্ধ হয়ে অনুষ্ঠান ত্যাগ করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে ভিত্তিহীন কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করলে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ক্রিসটেন ওয়েলকার তার কাছে প্রমাণ দাবি করেন। এর জের ধরেই দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়।
গত শুক্রবার উইসকনসিন সফরের সময় একটি খামারে সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয় এবং রোববার (৮ জুন) তা প্রচারিত হয়। সাক্ষাৎকার চলাকালে বৃষ্টি ও বৈরি আবহাওয়ার কারণে একাধিকবার শব্দজনিত বিঘ্ন দেখা দিলেও আলোচনা অব্যাহত ছিল। ইরান, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে প্রশ্নোত্তরের একপর্যায়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সাম্প্রতিক প্রাইমারি নির্বাচন নিয়ে তর্ক শুরু হয়।
সাক্ষাৎকারের একপযার্য়য়ে ওয়েলকার উল্লেখ করেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোট গণনার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই এমন। এর জবাবে ট্রাম্প দাবি করেন, অঙ্গরাজ্যটির নির্বাচনে ‘কারচুপি’ হয়েছে। তবে অভিযোগের পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি তিনি। ওয়েলকার বারবার প্রমাণ চাইলে ট্রাম্প বলেন, তিনি মানুষের কাছ থেকে এসব শুনেছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই এমন মন্তব্য করছেন।
এরপর আলোচনা আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, সংবাদমাধ্যম এবং নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ উভয়ই পক্ষপাতদুষ্ট। তিনি এনবিসি, ‘মিট দ্য প্রেস’ এবং ওয়েলকারকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে আখ্যা দেন। ওয়েলকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলে ট্রাম্প পাল্টা বলেন, তার প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক বিরোধীদের স্বার্থ রক্ষা করছে।
সাক্ষাৎকারের আরেক পর্যায়ে ট্রাম্প তার পূর্ববর্তী দাবি পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং সাম্প্রতিক ক্যালিফোর্নিয়া প্রাইমারিতে অনিয়ম হয়েছে। ওয়েলকার তখনও প্রমাণ উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়ে নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন।
নির্বাচন নিয়ে চলা তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে এনবিসি, এবিসি, সিবিএস এবং সিএনএন-কে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে সাক্ষাৎকার থেকে মাঝপথেই উঠে দাঁড়ান ট্রাম্প।
এ সময় ওয়েলকারকে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা একটি পক্ষপাতদুষ্ট নেটওয়ার্ক। দুঃখিত। চলুন এখানেই শেষ করি, কারণ আমার অনেক হয়েছে। ধন্যবাদ, ডার্লিং। ভালো থাকবেন।’
ট্রাম্প মাইক্রোফোন খুলে ফেলার ভঙ্গি করেন এবং আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। ওয়েলকার তাকে সাক্ষাৎকার চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানালেও ট্রাম্প জানান, তিনি বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেছেন এবং যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি এবিসি, সিবিএস ও সিএনএনসহ অন্যান্য মূলধারার সংবাদমাধ্যমেরও সমালোচনা করেন।
সাক্ষাৎকারটি শেষ হওয়ার পর ওয়াশিংটন স্টুডিও থেকে ওয়েলকার দর্শকদের জানান, আবহাওয়াজনিত বিঘ্নের বিষয়টি নিয়ে পরে তার সঙ্গে ট্রাম্পের কথা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে আরেকটি সাক্ষাৎকার দিতে সম্মত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে প্রমাণ চাওয়ার পর প্রেসিডেন্টের এমন প্রতিক্রিয়া দেশটির সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
মূলত ট্রাম্প ক্ষেপে যান যখন ওয়েলকার তাকে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত একটি তহবিল নিয়ে প্রশ্ন করেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে যেসব সরকারি কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি করছেন, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল।
এর জবাবে ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম ও বাইডেনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানুষের জীবন ধ্বংস করার অভিযোগ আনেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এই আইডিয়াটি পছন্দ করি, কারণ আপনার মতো মানুষ, এই ভুয়া নোংরা সংবাদমাধ্যম, এই দুর্নীতিগ্রস্ত সংবাদমাধ্যম, আর বোকা বাইডেনের মতো মানুষ—কী ঘটছে তা বোঝার মতো যথেষ্ট বুদ্ধি তার নেই, তবে যারা তাকে ঘিরে রেখেছিল, ওভাল অফিসে তার সুন্দর 'রেজোলিউট ডেস্ক' (প্রেসিডেন্টের মূল টেবিল)-কে ঘিরে রেখেছিল—তারা মানুষের জীবনের সাথে যা করেছে, তারা মানুষকে ধ্বংস করে দিয়েছে।’
ট্রাম্পের এই দাবির বিরোধিতা করে ওয়েলকার বলেন, ‘বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য বলছি, আপনি যা বলছেন তার কোনো প্রমাণ নেই।’
ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেন বলেন, ‘প্রচুর প্রমাণ আছে। প্রমাণ ছাড়া আর কিছুই নেই।’ ট্রাম্প এরপর ২০২০ সালের নির্বাচন কারচুপি হয়েছিল বলে তার দাবির পুনরাবৃত্তি করেন এবং এটিকে ক্যালিফোর্নিয়ার চলমান ভোট গণনার সঙ্গে জুড়ে দেন।
উপস্থাপিকাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘নির্বাচনে (২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন) কারচুপি হয়েছিল। এটি একটি নোংরা নির্বাচন ছিল। এবং ঠিক এই মুহূর্তে ক্যালিফোর্নিয়াতেও আবার একই ঘটনা ঘটছে।’
ট্রাম্প ক্যালিফোর্নিয়ার ভোট গণনার ধীরগতির দিকে ইঙ্গিত করেন, যেখানে রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যয়িত (সার্টিফাই) করতে এক মাসেরও বেশি সময় লেগে যায়।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাকে শুধু চেয়ে দেখতে হবে। তারা দুর্নীতিগ্রস্ত যেমনটা আপনি দুর্নীতিগ্রস্ত, আপনার সংবাদমাধ্যম দুর্নীতিগ্রস্ত। এবং ‘মিট দ্য প্রেস’-ও দুর্নীতিগ্রস্ত।’
সাক্ষাৎকারটি শেষ করার আগে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের নির্বাচন দুর্নীতিগ্রস্ত, এবং আপনি দুর্নীতিগ্রস্ত, এবং ‘মিট দ্য প্রেস’ দুর্নীতিগ্রস্ত। এবং এবিসি, সিবিএস ও সিএনএন-ও একই রকম।’