

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কেন ইরানে হামলা করেছে এবং এই যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে—এই প্রশ্ন এখন পুরো বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রে। সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন সংঘাত শুরু হয়েছে, তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা শুরু করে। এ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। একই সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একাধিক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার এবং প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ইরান দ্রুত নতুন সামরিক নেতৃত্ব নিয়োগ দিলেও দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ ঘটনার পরই দ্রুত পাল্টা হামলা শুরু করেছে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই অভিযানের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। তিনি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ইরানের সামরিক অবকাঠামো ‘মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে’। যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের জনগণ চাইলে বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে নিতে পারে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ইসরায়েলের জন্য ‘অস্তিত্বের হুমকি’ তৈরি করেছিল। তার দাবি, ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সরাসরি ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে গড়ে তোলা হচ্ছিল। নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত এই অভিযানকে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে ইরান এই হামলাকে ‘অবৈধ ও উসকানিমূলক আগ্রাসন’ বলে উল্লেখ করেছে।
হামলার জবাবে ইরান দ্রুত পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। তারা ইসরায়েল, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান এবং সৌদি আরবে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এমনকি সাইপ্রাসে একটি ব্রিটিশ ঘাঁটিও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। ইরান দাবি করেছে, তারা মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লেবাননের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করেছে। এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননের রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালায়। ফলে সংঘাত একাধিক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
এই যুদ্ধের বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ইরান এই নৌপথ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এবং কিছু জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এর ফলে বৈশ্বিক তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। কাতারের গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাসের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, সংঘাতে তাদের কয়েকজন সেনা নিহত হয়েছেন এবং বহু সেনা আহত হয়েছেন। একই সময়ে ইরানে শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করা হয়েছে এবং দেশটির আকাশসীমা বন্ধ রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, ৮৮ জন আলেমের সমন্বয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। আপাতত একটি অন্তর্বর্তী পরিষদ দেশ পরিচালনা করছে। তবে চলমান হামলার কারণে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।
যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই। ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজন হলে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ একই গতিতে অভিযান চালানো সম্ভব এবং প্রয়োজনে তারও বেশি সময় চলতে পারে। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে। নেতানিয়াহুও বলেছেন, যতদিন প্রয়োজন ততদিন অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, ইরান কতটা সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে এবং পাল্টা হামলা চালাতে পারে। দ্বিতীয়ত, সংঘাত কি শুধু ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, না কি এটি ইরাক, লেবানন বা উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়বে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কত দ্রুত কার্যকর হয়।
যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান আসে, তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত সীমিত হতে পারে। কিন্তু যদি ইরান দীর্ঘমেয়াদি ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ কৌশল নেয়—যেমন সাইবার হামলা, প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে আক্রমণ বা জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত। তবে যুদ্ধ মাসের পর মাস বা আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।
ভ্রমণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগেও বড় প্রভাব পড়েছে। বহু দেশের আকাশসীমা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের অঞ্চলটি ত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, তারা ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে চায় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। অন্যদিকে ইরান বলছে তারা আত্মরক্ষার জন্য প্রতিশোধমূলক হামলা চালাচ্ছে। এই সংঘাত কতদিন চলবে তা নির্ভর করছে সামরিক শক্তির ভারসাম্য, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর। তবে আপাতত স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্য এক গভীর ও বিস্তৃত অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবেশ করেছে, যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হচ্ছে।