

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। চলছে ধ্বংসাত্মক হামলা, পাল্টা হামলা। গোলা আর ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের চিরচেনা নীলাভ আকাশ। ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে প্রচুর। বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে শত শত সাধারণ মানুষ। তাই বিশ্বের সব শান্তিকামী মানুষ চায় ইরানের সঙ্গে এ অন্যায্য যুদ্ধ যত দ্রুত সম্ভব শেষ হোক। কিন্তু সংঘাত তো আর মানবিকতার অঙ্ক বোঝে না। যুদ্ধবাজদের মাথায় তো চলে স্বার্থের অঙ্ক। তাই প্রশ্ন উঠছে—কোন শর্তে এ সংঘাত শেষ হবে? এ যুদ্ধ ঘিরে একেক দেশ একেকরকম অবস্থানে রয়েছে। ফলে যুদ্ধের কীভাবে অবসান হবে, তা নিয়ে তাদের আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো কিছুটা অস্পষ্ট। কখনো তাকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল সীমিত করার পক্ষে, কখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সব দাবি মেনে নেওয়ার চাপে, আবার কখনো ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থার সম্পূর্ণ পতন ঘটানোর অবস্থানে দোদুল্যমান দেখা গেছে। এখন পর্যন্ত ইরানের পতন ঘটেনি, দেশটি আত্মসমর্পণও করেনি। তবে ১৮ দিনের টানা নিখুঁত বোমা হামলায় দেশটির সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।
ওমানের মধ্যস্থতায় গত ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল, তাতে পারমাণবিক বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছিল। ওমানি কর্মকর্তাদের মতে, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না এমন নিশ্চয়তা দিয়ে ইরান বড় ধরনের ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিল। তবে ইরান যা নিয়ে আলোচনা করতে রাজি ছিল না, তা হলো তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি এবং ইয়েমেনের হুতি বা লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক ছায়াগোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া সমর্থন বন্ধ করা।
ওয়াশিংটন এবং তাদের মিত্রদের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি হতো যদি এ যুদ্ধের মাধ্যমে আয়াতুল্লাহদের শাসনের অবসান ঘটে এবং দ্রুত সেখানে একটি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার আসে; যারা নিজেদের জনগণ বা প্রতিবেশীদের জন্য আর হুমকি হবে না। কিন্তু মঙ্গলবার পর্যন্ত তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্বিতীয় সেরা ফলাফল হতে পারত যদি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র তাদের আচরণ পরিবর্তন করে, নাগরিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করে এবং ওই অঞ্চলের উগ্রপন্থি মিলিশিয়াদের সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে।
তবে ইরান যখন তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিকে বেছে নিয়েছে, তখন সেটা হওয়ার সম্ভাবনা কমই মনে হচ্ছে। প্রয়াত পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবাকে বেছে নেওয়া ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করারই নামান্তর।
বিশ্ববাজারে তেলের ক্রমবর্ধমান দাম, হরমুজ প্রণালি আংশিক রুদ্ধ হওয়া এবং আমেরিকার আবারও মধ্যপ্রাচ্যের এক ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তে থাকা অস্বস্তি—সব মিলিয়ে যুদ্ধ বন্ধের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। কিন্তু তেহরানের শাসনব্যবস্থা যদি দমে না গিয়ে অবাধ্যই থেকে যায়, তবে ট্রাম্পের পক্ষে এ যুদ্ধকে ব্যর্থতা ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে তুলে ধরা কঠিন হবে।
ইরান
ইরান চায় যুদ্ধ যত দ্রুত সম্ভব থামুক, তবে সেটা ওয়াশিংটনের সব দাবি মেনে নয়। তারা জানে যে, এই যুদ্ধে ট্রাম্পের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকার মতো ‘কৌশলগত ধৈর্য’ তাদের আছে। তার ওপর ভৌগোলিক অবস্থানও তাদের অনুকূলে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ইরানের উপকূলরেখা দীর্ঘতম। সরু হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়, যেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি করার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে যে যুদ্ধ ট্রাম্প শুরু করেছেন, তার পরিণতি সামাল দিতে তিনি অন্যান্য দেশের প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাতে খুব একটা সাড়া মিলছে না। যুক্তরাজ্য, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশ তাদের নৌবাহিনীকে ঝুঁকির মুখে ফেলে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে পাহারা দিতে নারাজ, কারণ শুরু থেকেই তারা এ যুদ্ধের পক্ষে ছিল না। আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান বলছে, যুদ্ধ শেষ হতে হবে এ অকাট্য গ্যারান্টির মাধ্যমে যে তাদের ওপর আর হামলা হবে না। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণও তারা চায়।
ইরান সম্ভবত জানে যে এর কোনোটিই তারা পাবে না। কিন্তু ইরানের ইসলামী নেতৃত্ব এবং রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) যদি এ সংঘাতে টিকে থাকতে পারে, তবেই তারা নিজেদের জনগণ ও বিশ্বের কাছে একে বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।
ইসরায়েল
যুদ্ধে জড়িত তিনটি দেশ—ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ইসরায়েলিদের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ করার তাড়া সবচেয়ে কম মনে হচ্ছে। তারা ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের মজুত, গুদাম, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, রাডার স্টেশন এবং আইআরজিসি ঘাঁটিগুলো যতটা সম্ভব ধ্বংস হতে দেখতে চায়।
অবশ্য যুদ্ধ থামলে এসবই আবার পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব। তাই ইসরায়েল চায় ইরান এটা বুঝুক যে, পুনর্নির্মাণের চড়া মূল্য দিতে হবে—অর্থাৎ ইসরায়েলি বিমানবাহিনী কয়েক মাস পর আবারও ফিরে এসে সেগুলোতে বোমা ফেলতে সক্ষম।
ইসরায়েল ইরানের মিসাইল এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। যুদ্ধ শুরুর আগপর্যন্ত ইরানের অত্যন্ত উন্নত নিজস্ব মিসাইল ও ড্রোন শিল্প ছিল। এ ছাড়া ইরান ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, যা বেসামরিক পারমাণবিক শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এই দ্বিমুখী হুমকিকে এমন কিছু হিসেবে দেখছে, যার সঙ্গে ইসরায়েল আপস করতে পারে না।
উপসাগরীয় দেশগুলো
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমান—এ আরব দেশগুলো ভেবেছিল তারা সমুদ্রের ওপারের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সঙ্গেই মানিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধকে সমর্থন না জানানো সত্ত্বেও তারা ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার শিকার হচ্ছে—এতে তারা ক্ষুব্ধ। শুধু সোমবারের প্রথম কয়েক ঘণ্টাতেই সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ছোড়া ৬০টিরও বেশি প্রজেক্টাইল ভূপাতিত করেছে। এক উপসাগরীয় কর্মকর্তা বলেন, সীমারেখা অতিক্রম করা হয়েছে। তেহরানের সঙ্গে আমাদের আর কোনো আস্থা নেই এবং এরপর তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়।