

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ হয়তো সাময়িকভাবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জনসমর্থন কিছুটা বাড়িয়েছে। তবে এখনই নির্বাচন হলে নেতানিয়াহু প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হতে পারেন বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। যদিও এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যে বাঁকবদল ঘটনা হতে পারে। এমনকি এটি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও হুমকিতে ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ ১৮ বছর ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তলানিতে ঠেকেছিল। এর ওপর ঘুষ ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে চলমান বিচার প্রক্রিয়া তাকে এমনিতেই নাজুক অবস্থায় রেখেছিল। তবে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যদি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরান সরকারের পতন ঘটে, তবেই রাজনৈতিক এ অচলাবস্থা নেতানিয়াহুর অনুকূলে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে অন্যথায় বিপাকে পড়তে পারেন নেতানিয়াহু। ৫ মার্চ প্রকাশিত ইসরায়েল ডেমোক্যাসি ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ ইসরায়েলি ইরানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।
টাইমস অব ইসরায়েলের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাল স্নাইডার বলেন, অধিকাংশ ইসরায়েলি ৭ অক্টোবরের বিপর্যয়ের জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করলেও ইয়াহিয়া সিনওয়ার, ইসমাইল হানিয়াহ এবং হাসান নাসরুল্লাহর মতো নেতাদের হত্যার কৃতিত্ব তাকেই দিচ্ছেন। স্নাইডার বলেন, তা সত্ত্বেও ইসরায়েলের জনমত মূলত আগের মতোই দুটি রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত।
বর্তমানে ক্ষমতাসীন কট্টর-ডানপন্থি জোট এবং বিস্তৃত বিরোধী শিবিরের মধ্যে কোনো পক্ষই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অবস্থানে নেই। গত সপ্তাহের জনমত জরিপগুলো বলছে, যুদ্ধের প্রতি ব্যাপক সমর্থন থাকলেও তা ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দে বড় কোনো প্রভাব ফেলেনি। আর এখন ইরান যুদ্ধে আশানুরূপ ফল না এলে নেতানিয়াহুর জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।
চ্যানেল ১৩-এর ১০ মার্চের এক জরিপ অনুযায়ী, ২৫টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে টিকে থাকবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। নাফতালি বেনেটের দল পাবে ১৭টি আসন। আর নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোট পেতে পারে মোট ৫১টি আসন, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা থেকে ১০টি কম।
হিব্রু ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গিডিয়ন রাহাত মনে করেন, যুদ্ধের মাধ্যমে নিজের ভাবমূর্তি উদ্ধারের স্বপ্ন দেখছিলেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, সময় যত গড়াচ্ছে, মনে হচ্ছে ইরান সরকারের পতন অত সহজে হবে না। ফলে নেতানিয়াহু হয়তো সেই বিজয়ের ছবি পাবেন না, যা তিনি আশা করেছিলেন। রাহাতের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়েই যুদ্ধের শুরুতে প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে বেঁধে দিয়ে ভুল করেছেন। আরও পরিমিত লক্ষ্য নির্ধারণ করলে তাদের জন্য বিজয় ঘোষণা করা সহজ হতো। তিনি আরও বলেন, ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার পরও নেতানিয়াহু যেভাবে টিকে আছেন, তাতে তিনি আবারও ২০২২ সালের মতো বারবার নির্বাচন দিয়ে বিরোধী জোট ভাঙার চেষ্টা করতে পারেন।
ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচন আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে হওয়ার কথা। তবে বিরোধী নেতাদের ধারণা, নেতানিয়াহু যুদ্ধের সাফল্যকে পুঁজি করে এবং ৭ অক্টোবরের বার্ষিকীর আগেই আগাম নির্বাচন দিতে পারেন। বিরোধী দলের একজন বলেন, নেতানিয়াহু চান না নির্বাচনের প্রচার ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা বা তদন্ত কমিশন গঠনের দাবির ওপর ফোকাস হোক। তিনি বরং ইরান যুদ্ধের অর্জনকেই প্রচারের মূল হাতিয়ার বানাতে চান।
যুদ্ধের চেয়েও ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে আল্ট্রা-অর্থোডক্স বা অতি-গোঁড়া ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের অব্যাহতি। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে যে, অতি-গোঁড়া ইহুদি তরুণরা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার অজুহাতে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না। বিশ্লেষক তাল স্নাইডার বলেন, নেতানিয়াহু-বিরোধী শিবিরের মূল চালিকাশক্তি হলো অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো।