

প্রকৌশল শিক্ষার ইতিহাসে একটি উত্তাল দিন গেল গতকাল বৃহস্পতিবার। তিন দফা দাবিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) সারা দেশের সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সর্বাত্মক ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেছেন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করেছেন তারা। বুয়েটে সাপ্তাহিক ছুটি থাকা সত্ত্বেও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষাগুলো বর্জন করেছেন শিক্ষার্থীরা।
এই আন্দোলনের ঢেউ ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে যায় রাজধানী ছাড়াও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। এদিকে, বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যমুনা অভিমুখে পদযাত্রায় পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা জানান, প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের ডাকা ‘ইঞ্জিনিয়ার্স রাইটস মুভমেন্ট’ প্ল্যাটফর্মের অধীনে গতকাল সকাল থেকে দেশের সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করা হয়। কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে যায়। বেশ কয়েকটি ক্যাম্পাসে কোনো শিক্ষার্থীরই দেখা মেলেনি।
বুয়েটে গতকাল সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। তবে পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষাগুলো স্থগিতের পাশাপাশি আগামীকাল ৩০ আগস্ট থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্নাতক পর্যায়ের সব পরীক্ষা স্থগিত করে বুয়েট প্রশাসন।
পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ডাকা কর্মসূচিতে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সংহতি প্রকাশ করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। চলমান আন্দোলনের সমর্থনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
শাবিপ্রবি প্রতিনিধি জানান, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও অন্তর্বর্তী সরকারের গায়েবানা জানাজা পড়েন প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরা। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল চত্বরে এসব কর্মসূচি পালন করেন তারা।
খুলনা ব্যুরো জানায়, কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচিতে একাত্মতা প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীদের অনুমতি নিয়ে ক্লাস পরীক্ষা চালায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কুয়েট ছাত্রকল্যাণ পরিচালক বি এম ইকরামুল হক বলেন, ঢাকার শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে সব কর্মসূচির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন শিক্ষার্থী। কুয়েট যেহেতু দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল, তাই একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করি, তারাও এতে সম্মতি দেয়। সেজন্য আজ (গতকাল) ক্লাস-পরীক্ষা হয়েছে।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত তারা এই সড়ক অবরোধ করে রাখেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন রুয়েট শিক্ষার্থীরাও। এ সময় সড়কের দুই পাশে যানজট সৃষ্টি হয়।
নাটোর প্রতিনিধি জানান, কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ক্লাস বর্জন ও বিক্ষোভ করেন নাটোর টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টায় প্রতিষ্ঠানের মূল ফটকে বিক্ষোভ করেন তারা। একইভাবে প্রতিবাদ জানান নাটোরের বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির (বাউয়েট) শিক্ষার্থীরা।
তিন দফা দাবি: শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং নবম গ্রেড (সহকারী প্রকৌশলী বা সমমান) পদে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবাইকে মেধাক্রমে উত্তীর্ণ হতে হবে এবং অবশ্যই বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি থাকতে হবে। কোটার মাধ্যমে কোনো পদোন্নতি বাতিল করা, অন্য নামে সমমান পদ সৃজন করেও পদোন্নতির সুযোগ রাখা বন্ধ করা। টেকনিক্যাল দশম গ্রেডের (উপসহকারী প্রকৌশলী বা সমমান) পদ পূরণের ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা ও বিএসসি উভয় ডিগ্রিধারীদের সমানভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে সুযোগ দেওয়া এবং বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি ছাড়া কেউ প্রকৌশলী পদবি ব্যবহার করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
উচ্চপর্যায়ের কমিটির প্রথম বৈঠক: প্রকৌশল পেশায় বিএসসি ডিগ্রিধারী ও ডিপ্লোমাধারীদের পেশাগত দাবিগুলোর যৌক্তিকতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য গঠিত সরকারের উচ্চপর্যায়ে কমিটি প্রথম বৈঠক করেছে গতকাল। জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে কমিটির অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে বন ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘কমিটি কেমন করে কাজ করবে, আজ (গতকাল) আমরা সেটা ঠিক করেছি। যে সমস্যাগুলো এসেছে, সেগুলো আজকের নয়, বহুদিন আগের সমস্যা। তাই এগুলো সমাধান করতে হলে সবার সঙ্গে আমাদের পরামর্শ করতে হবে। সেজন্য আমরা একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ করেছি। সেই ওয়ার্কিং গ্রুপে মোট ১৪ জন প্রতিনিধি থাকবেন। যে সংস্থাগুলোতে ইঞ্জিনিয়ার রিক্রুট করা হয়, সেই সংস্থা প্রধানরা এ কমিটিতে থাকবেন। একই সঙ্গে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের থেকেও চারজন প্রতিনিধি থাকবেন। মোট ১৪ জনের সমন্বয়ে এটা হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে সেখানে।
নতুন কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের: দেশের সব সরকারি-বেসরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান ‘কমপ্লিট শাটডাউন অব ইঞ্জিনিয়ার্স’ সঙ্গে নতুন করে কর্মসূচি দিয়েছে প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলন। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত শাটডাউন বলবৎ থাকবে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী বিভাগীয় প্রকৌশলী সমাবেশ এবং সপ্তাহব্যাপী সমাবেশ শেষে ঢাকায় জাতীয় মহাসমাবেশের করার হুঁশিয়ারি দেন তারা।
গতকাল বিকেলে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন প্ল্যাটফর্মের সভাপতি মো. ওয়ালি উল্লাহ। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে পদগুলো শুধু ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়, সেখানে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের কোনো সুযোগই দেওয়া হয় না। এটি বন্ধ করতে হবে। আন্দোলনটা আমাদের তিন দফার ওপর চলছিল এবং গতকাল (বুধবার) যে ম্যাসিভ ইনসিডেন্ট হয়েছে, এগুলো সুরাহা হতে হবে। সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এখনো তার বাস্তবায়ন পাইনি।
ডিএমপির তদন্ত কমিটি: বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যমুনা অভিমুখে পদযাত্রায় পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ডিএমপি।
গতকাল ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (লজিস্টিকস, ফিন্যান্স অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট) হাসান মো. শওকত আলীকে। সদস্য সচিব হয়েছেন উপপুলিশ কমিশনার (অর্থ) সাদেক হাসান এবং সদস্য হিসেবে রয়েছেন যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক উত্তর) সুফিয়ান আহমেদ।
ডিএমপির আদেশে বলা হয়, বুধবার শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবিতে শাহবাগে সমবেত হন। একপর্যায়ে বুয়েট শিক্ষার্থীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে পদযাত্রা শুরু করেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে পৌঁছে পুলিশের বাধা অতিক্রমের চেষ্টা করলে পুলিশ বলপ্রয়োগ করে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে পুলিশের বলপ্রয়োগের যৌক্তিকতা, ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কর্তব্যরত সদস্যদের দায়দায়িত্ব নিরূপণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কমিটিকে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।