

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে অপেক্ষার প্রহর শেষ। আলোচিত এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ পর্যন্ত হবে কি হবে না, এমন সংশয় ও প্রশ্ন ছিল শিক্ষার্থী ও নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মাঝে। তবে সব সংশয় দূর করে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আজ বৃহস্পতিবার হতে যাচ্ছে এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ।
রাকসু প্রতিষ্ঠার ৬৩ বছরের মাথায় ১৫তম নির্বাচন আজ। এর মাঝে পাকিস্তান আমলে নির্বাচন হয়েছে সবচেয়ে বেশি আটবার। স্বাধীনতার পাঁচ দশকে রাকসু নির্বাচন হয়েছে সবচেয়ে কম, মাত্র ছয়বার। ৮০-এর দশকের পরবর্তী সময়ে কার্যত ঝিমিয়ে পরা রাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে।
প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনগুলোর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীদের সৃজনশীল ও ভিন্নধর্মী প্রচারণা, সময়োপযোগী ইশতেহার ও ডিজিটাল ক্যাম্পেইন এবারের ভোটযুদ্ধকে করেছে আরও রঙিন। ভোটগ্রহণ ঘিরে ক্যাম্পাসজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে এবং স্বাধীনভাবে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছেন শিক্ষার্থীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দু-একটি সংগঠনের মধ্যকার ঐতিহ্যগত দ্বন্দ্ব ছাপিয়ে এবারকার নির্বাচন হতে যাচ্ছে রাকসুর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। বেশ কয়েকটি দিক থেকে রেকর্ড গড়েছে এবারের নির্বাচন। যার মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চসংখ্যক প্রার্থীর লড়াই, প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষার্থীর একসঙ্গে ভোটদান এবং প্রথমবারের মতো প্রার্থিতা বাছাইয়ে ডোপ টেস্ট।
রাকসুর এবারের ভোটে আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ মিলিয়ে অংশ নিচ্ছে ১১টি প্যানেল। এর বাইরে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন প্রার্থীদের আরেকটি অংশ। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের প্যানেলভুক্ত এবং স্বতন্ত্র কয়েকজন প্রার্থী জয়ের লড়াইয়ে এগিয়ে আছেন বলে জরিপ ও শিক্ষার্থীদের আলোচনায় উঠে এসেছে। এর বাইরে রাকসুর ইতিহাসে একমাত্র নারী ভিপি প্রার্থী তাসিন খান এবং আধিপত্যবাদবিরোধী ঐক্য, ছাত্র-অধিকার পরিষদ ও বামজোট সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরাও আলোচনায় রয়েছেন।
জয়-পরাজয়ের সমীকরণ: এবারের রাকসু নির্বাচন হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের। নির্দিষ্ট কোনো পদে কে জয়ী হবেন, তা আগেভাগে অনুমান করা কঠিন হলেও নারী ভোটার, অনাবাসিক শিক্ষার্থী এবং প্রথম বর্ষের ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের সমীকরণে পার্থক্য গড়ে দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোট ভোটারের ৬৮ শতাংশই অনাবাসিক। তাদের অনেকেই ছাত্র সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক আবহ থেকে থাকেন অনেকটাই দূরে। এসব ভোটের পাল্লা যেদিকে বেশি ঝুলবে, সেসব প্রার্থীই অনেকটা এগিয়ে থাকবেন। আর নারী ভোটার প্রায় ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ, সংখ্যায় যা ১১ হাজার ৩০৫।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, নারী ভোটারদের ভোট যারা বেশি পাবেন, তাদেরই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ ছাড়া ছাত্রদলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্ত হওয়া প্রথম বর্ষের প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থীর ভোট জয়-পরাজয়ের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে মনে করছেন অনেকে।
৪৩ পদে লড়ছেন ৯১৮ জন প্রার্থী: সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। তবে ৪টার মধ্যে যারা কেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করবেন, যত সময় লাগুক, তারা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। রাকসুর কেন্দ্রীয় ২৩টি পদে ৩০৫ জন, সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের পাঁচটি পদে ৫৮ জন এবং প্রতিটি হল সংসদের ১৫টি করে পদে ১৭টি হলের মোট ২৫৫টি পদে মোট ৫৫৫ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মোট ভোটার ২৮ হাজার ৯০১ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ১১ হাজার ৩০৫ জন (৩৯.১ শতাংশ) ও ছাত্র ১৭ হাজার ৫৯৫ জন (৬০.৯ শতাংশ)। ক্যাম্পাসের নির্ধারিত ৯টি ভবনে (৯৯০টি বুথ) শিক্ষার্থীরা ভোট দেবেন।
ভোট গণনা হবে ছয়টি অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) মেশিনে।
জাল ভোট ঠেকাতে ‘থ্রিডি সিস্টেম’: এ নির্বাচনে জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি নির্বাচন কমিশনের। ভোটকেন্দ্রে একজন ভোটার তিন স্তরের যাচাই শেষে ভোট দেবেন। প্রতিটি ধাপে ফুলপ্রুফ নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, ‘আমরা থ্রিডি লেভেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি। প্রথম ধাপে যাচাই করা হবে ভোটারের শিক্ষার্থী আইডি কার্ডের সত্যতা। দ্বিতীয় ধাপে মিলিয়ে দেখা হবে ভোটারের ইউনিক আইডি নম্বর। তৃতীয় ধাপে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা থেকে যাচাই শেষে ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।’
ফলাফল প্রস্তুতে ৪৩ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি করা হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকন্দ। ১৭ ঘণ্টার ভেতরে ফলাফল প্রকাশ করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওএমআর মেশিনের সক্ষমতা অনুযায়ী আমরা আশা করছি সর্বোচ্চ ১৭ ঘণ্টার ভেতর ফল প্রকাশ করতে পারব।’
তিন স্তরের নিরাপত্তা: রাকসু নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি)। আজ ভোটের দিন দুই হাজার পুলিশ, ১২ প্লাটুন র্যাব, ছয় প্লাটুন বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা, বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন বলে জানিয়েছেন আরএমপি কমিশনার আবু সুফিয়ান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, ‘হলগুলোয় যাতে কোনো বহিরাগত না থাকে বা কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য তল্লাশি চালানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি।’