

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। একের পর এক দল ঘোষণা করছে তাদের প্রার্থীদের নাম। এরই মধ্যে বিএনপি ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তার আগে ২৯৬ আসনে প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামী। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) শিগগির দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামের তালিকা প্রকাশ করতে যাচ্ছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার তিন আসন ছাড়া বাকি ২৯৭ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। এনসিপি এককভাবে প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করবে, তবে একই সঙ্গে জোট গঠন বা আসন সমঝোতা নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকবে। এসব বিষয় বিবেচনা করে নির্বাচনের আগে আগে নেওয়া হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
এনসিপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা কালবেলাকে জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে প্রথম ধাপে ১০০ থেকে ১৫০ আসনের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের আসন প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে। বাকি আসনগুলোর প্রার্থী বাছাইয়ে তোড়জোড় চলছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্মানে তিনটি আসন ফেনী-১, দিনাজপুর-৩ এবং বগুড়া-৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা না করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর বাইরে ২৯৭ আসনের প্রার্থী তালিকায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও স্থানীয় প্রভাবশালী এবং বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের মনোনয়ন না পওয়া ‘হেভিওয়েট’ ও তরুণ নেতাদের টানার চেষ্টা চলছে।
এনসিপির শীর্ষপর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, অন্যান্য দলের মতো এককভাবে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। তবে শেষ পর্যন্ত জোট কিংবা আসন সমঝোতা হতে পারে। বিএনপি, জামায়াতসহ অন্য দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা চলমান আছে। তবে বিএনপির সঙ্গে সে আলোচনা এগিয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, এনসিপি নেতাদের সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী জোট বা আসন সমঝোতা নিয়ে দুই দলের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এনসিপির সঙ্গে লিয়াজোঁ করছেন। এনসিপির নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেনসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা বিএনপির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও আলোচনা চলমান আছে। নির্বাচনের আগে আগে দরকষাকষির মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে সিদ্ধান্ত।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার কালবেলাকে বলেন, ‘জোট কিংবা আসন সমঝোতার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও যাচাই-বাছাই চলছে। বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা চলছে। আমরা আগামী সপ্তাহে প্রার্থীদের নামের তালিকা ঘোষণা করব। সারা দেশে আমাদের সক্ষমতা তৈরি করতে চাই—অন্তত যেন প্রতিটি আসনে আমাদের প্রার্থী থাকে। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী সমঝোতা বা জোটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এদিকে প্রাথমিকভাবে যেসব আসনে বিএনপি প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে, সে তালিকা যাচাই করে দেখা গেছে, এনসিপির শীর্ষ নেতাদের আসনেও সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। এনসিপি নেতাদের মধ্যে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১, সদস্য সচিব আখতার হোসেন রংপুর-৪, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কুমিল্লা-৪, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ নোয়াখালী-৬, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন ভোলা-১, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ঢাকা-১৪ এবং যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার নরসিংদী-২ আসনে নির্বাচন করবেন। এসব আসনের সবগুলোতেই প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি।
এ বিষয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘বিএনপি তাদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছে, চূড়ান্ত তালিকা নয়। আমরাও সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করব। যদি সংস্কার, বিচার এবং নতুন বাংলাদেশের প্রত্যয়ে কোনো বোঝাপড়া হয় তার সুযোগ আছে। বিএনপি, জামায়াত যে কারও সঙ্গেই সমঝোতা হতে পারে। সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলমান রয়েছে।’
এনসিপির অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ঢাকা-১৮ আসনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, ঢাকা-৯ বা ঢাকা-১৭ তে তাসনিম জারা, ঢাকা-১৩ আকরাম হুসেইন, নারায়ণগঞ্জ-৪ আবদুল্লাহ আল আমিন, কুষ্টিয়া-১ নুসরাত তাবাসসুম, চট্টগ্রাম-১৬ আসনে মীর আরশাদুল হক, ঢাকা-৫ মো. নিজাম উদ্দিন, সিরাজগঞ্জ-৫ মাহিন সরকার, নওগাঁ-৫ মনিরা শারমিন, পটুয়াখালী-২ মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন, কুড়িগ্রাম-২ আতিক মুজাহিদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আশরাফ উদ্দীন মাহাদী, সিরাজগঞ্জ-২ এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, কুমিল্লা-১০ জয়নাল আবেদীন শিশির, বাগেরহাট-৩ মোল্যা রহমতুল্লাহ, নীলফামারী-৪ আবু সাঈদ লিয়ন, ঠাকুরগাঁও-৩ গোলাম মর্তুজা সেলিম, মেহেরপুর-২ সাকিল আহমাদ, ময়মনসিংহ-৯ আশিকিন আলম, নরসিংদী-৫ আবদুল্লাহ আল ফয়সাল, ঢাকা-৬ খান মুহাম্মদ মুরসালীন, কুমিল্লা-৬ নাভিদ নওরোজ শাহ, ময়মনসিংহ-৫ মিরাজ মেহরাব তালুকদার, নেত্রকোনা-২ ফাহিম রহমান খান পাঠান, মেহেরপুর-১ সোহেল রানা এবং সাইয়েদ জামিল রাজবাড়ী-২ আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করব। তারপর মাঠ যাচাই করে জনগণের সম্মতি নিয়ে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করব। যারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছে তাদের সবাইকে আমরা সংসদে দেখতে চাই, সবার প্রতি সম্মান রয়েছে। তবে বেগম খালেদা জিয়ার আসনে আমরা প্রার্থী দেব না।’
প্রার্থী তালিকায় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও স্থানীয় প্রভাবশালী এবং বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের ‘মনোনয়ন বঞ্চিত’ ‘হেভিওয়েট’ ও তরুণ নেতাদের টানার চেষ্টা চালাচ্ছে এনসিপি। দলটির নির্বাহী কমিটির এক সদস্য কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য দলের বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য এবং তরুণ নেতৃত্ব আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, আমরাও যোগাযোগ রাখছি। প্রার্থী মনোনয়নে আমরা চমক দেখাতে চাই। আশা করি, এককভাবে নির্বাচন করলেও বেশ কয়েকটি আসনে আমরা জেতার মতো সক্ষমতা রাখব।’
এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কথায়ও সেই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামটরের রূপায়ন টাওয়ারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পাটওয়ারী বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থী তালিকায় গডফাদারদের আধিপত্য স্পষ্ট। তরুণ নেতৃত্বকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমরা ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাদের আমাদের দলে স্বাগত জানাই। তারা যদি এনসিপিতে যোগ দেন, আমরা তাদের নিয়েই প্রার্থী ঘোষণা করব।’
প্রার্থী ঘোষণা না করলেও এরই মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। এতে প্রধান করা হয়েছে দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে। একই কমিটির সেক্রেটারি করা হয়েছে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারাকে। এ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আরিফুল ইসলাম আদীব, মাহবুব আলম মাহির, খালেদ সাইফুল্লাহ, এহতেশাম হক, আব্দুল্লাহ আল আমিন, আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, জহিরুল ইসলাম মুসা, হুমায়রা নূর, সাইফুল্লাহ হায়দার ও মো. তারিকুল ইসলাম।
কমিটির সদস্য এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণের সার্বিক প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা, প্রার্থী বাছাই, মাঠ পর্যায়ের সমন্বয়, আইনি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম, মিডিয়া ও প্রচারণা এবং প্রশিক্ষণ ও মনিটরিংয়ের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী কাজ শুরু করেছি। শিগগির আমরা প্রাথমিকভাবে ১৫০-১৬০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করব।’
জোট গঠন নিয়ে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘এনসিপি এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইলেকটোরাল অ্যালায়েন্স (নির্বাচনী জোট) করবে কি না। যদি করে অবশ্যই এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে করবে, তা হচ্ছে—যারা আগামীর বাংলাদেশে জুলাই সনদের প্রতিটি সংস্কার বাস্তবায়নে কাজ করবে, যারা বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করবে, যারা শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসনের জন্য কাজ করবে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের স্বার্থে আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থান ও ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান থাকলে এনসিপি তাদের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করতে পারে।’
এর আগে রোববার এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানান, তিনি ঢাকাতেই প্রার্থী হবেন। নির্বাচন কেন্দ্র করে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি।
তিনি বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করেছি। আশা করছি, এ মাসের মধ্যেই এনসিপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে পারব। কোনো জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। যদি জোটে যেতে হয়, তা অবশ্যই একটা নীতিগত জায়গা থেকে আসবে। জুলাই সনদ আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মৌলিক জায়গা।’