

মাত্র ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনবার ভূমিকম্পে কেঁপেছে দেশ। এর ফলে মানুষের মধ্যে আবার নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে এত ঘন ঘন কম্পন বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যদিও এ কম্পনগুলোর মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ছিল, তবুও আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন মানুষ।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সূত্র জানিয়েছে, বুধবার রাত ৩টার পর থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত প্রায় ১৩ ঘণ্টার মধ্যে এ কম্পনগুলো অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এসব কম্পনের মাত্রা ছিল মৃদু ও মাঝারি।
গতকাল বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটের দিকে রাজধানীতে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির। তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর ঘোড়াশালে। এটি ছিল মৃদু মাত্রার ভূমিকম্প; রিখটার স্কেলে এটি ছিল ৩ দশমিক ৬ মাত্রার। সম্প্রতি যে ভূমিকম্প হয়েছে তারই আফটার শক এটি। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।’
এর আগে প্রথম ভূমিকম্প অনুভূত হয় টেকনাফে। বুধবার রাত ৩টা ২৯ মিনিটে ৪ মাত্রার এ ভূমিকম্পে কেঁপেছে টেকনাফ শহর। এর উৎপত্তিস্থল টেকনাফ থেকে ১১৮ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরে। ভূকম্পনবিষয়ক ওয়েবসাইট ভলকানো ডিসকভারি জানিয়েছে, টেকনাফে খুব অল্প ঝাঁকুনি দেওয়ায় বেশিরভাগ মানুষ এটি টের পায়নি। ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র বলেছে, এটি মাটির ১০ কিলোমিটার গভীরে সংঘটিত হয়েছিল।
এরপর সিলেটে একই দিন রাত সাড়ে ৩টায় ৪৯ সেকেন্ডের মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৪। মৃদু কম্পন হওয়ায় অনেকেই টের পাননি। সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ভারতের জাতীয় ভূকম্পবিদ্যা কেন্দ্র জানিয়েছে, ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৬ এবং এর গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার ভেতরে।
গত ২১ নভেম্বর শুক্রবার সকালে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে বাংলাদেশে। ওই ভূমিকম্পে তিন জেলায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয় এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হন। রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদীতে এবং এর কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। পরদিন সকালে নরসিংদীর পলাশে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। তার রেশ না কাটতেই সন্ধ্যায় সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি ভূমিকম্প হয়, যার একটি উৎপত্তিস্থল ঢাকার বাড্ডা, আরেকটি সেই নরসিংদীতেই।
বারবার ভূমিকম্পের পর এখনই করণীয় ঠিক করতে তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, গত শুক্রবারের ভূমিকম্পটা বলা যেতে পারে ‘ফোরশক’। বড় ভূমিকম্পের আগে ছোট ছোট যে ভূমিকম্প, এটা সেগুলোর একটি।
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার মনে করেন, বড় ধরনের একটি ভূমিকম্পের বিপদ বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে। ওই ঝুঁকি বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে জনগণের সচেতনতা, সরকারের পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতির অভাবে।
তার ভাষ্য, ভূমিকম্প ঠেকানো যাবে না, প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, আগাম সংকেতও দেওয়া যাবে না; কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব—যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। সব কথার শেষ কথা যেটা হচ্ছে, আমাদের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধ বা ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
এদিকে ভূমিকম্প নিয়ে জনমনে আতঙ্কের মধ্যে গত সোমবার বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ওই বৈঠক একটি টাস্কফোর্স গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।